আনিফ রুবেদ
কথাকার জাকির তালুকদারের ‘প্রিয় ১৫ গল্প’ বইটি প্রায় একপক্ষ ধরে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে রয়েছে এবং আজকে বইটির পাঠ সমাপ্ত করেছি। যদিও বইটি আমার সংগ্রহে ছিল আরও ক’বছর আগে থেকেই।
এটিকে একটি বিশেষ বই বলেই মনে করছি। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় মাপকাঠিটা লেখকের নিজের কাছেই থাকে, যা দিয়ে তিনি তার লেখাকে মেপে থাকেন। ঠিক এ কারণেই বইটি বিশেষ; এ বইতে লেখকের নিজের প্রিয় পনেরোটা গল্প রয়েছে। একজন লেখককে জানতে হলে তার প্রিয় পনেরোটা গল্প পাঠ করা যথেষ্ট না হলেও একেবারে কমও নয়।
কোনো গল্প বা যে কোনো লেখা পড়ার সময় বা চিত্র দেখার সময় এর দার্শনিক দিক এবং প্রকাশের কৌশলটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। চেষ্টা করে কিছু একটা পাই হয়তো কিন্তু সেসব পাওয়া ভাবকে প্রকাশ করার যে কলাকৌশল, তা আমার খুব কম; সেই কমতির সাক্ষর এই লেখাতে পাওয়া যাবে।
বইটির পনেরোটা গল্পে পনেরোটা বিষয় উঠে এসেছে এবং বয়ান কৌশলেও বেশ নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য রয়েছে। যেমন- প্রথম গল্প ‘কন্যা ও জলকন্যা’তে একই সাথে দুটি গল্পকে একসাথে এগিয়ে যেতে দেখা যায়; যার একটি গল্প বর্তমানে ঘটছে এবং একটি গল্প ঘটে গেছে অনেক আগেই। এখানে বর্তমান একটা সুতা এবং অতীত একটা সুতা; এই দুই সুতাতে একটি রশি পাকানো হয়েছে; এ কৌশলটি চমৎকার লেগেছে আমার।
‘দিনযাপন কিংবা মৃত সুন্দরীর গল্প’ নিম্নমধ্যবিত্তের শিক্ষিত পরিবারের একটি মেয়ের গল্প। মেয়েটি তার সমস্ত জীবন আর শক্তি একটি এনজিওতে চাকরি করে ব্যয় করেও তার পরিবারের মন রক্ষা করতে পারে না। এমনকি তার প্রেমিকের সাথে তার বিয়েটাও হয় না। কারণ মেয়েটির নিজ পিতাই প্রেমিকের কাছে মেয়ের চরিত্র খারাপ বলে চিঠি দেয়। গল্পটি পড়লেই বোঝা যাবে কেন তার বাবা এমন নির্মম কাজটি করেছে।
আমরা শুনেছি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, দুটো ডালভাতের ব্যবস্থা না করে আমাদের দেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না আসে। সেই মানিকবাবুর জীবন নিয়ে ‘মানিক বাঁড়ুজ্জের সাথে যাবার সময়’ নামক গল্প লিখেছেন জাকির তালুকদার। করুণ রসের গল্পটি আমাদের হৃদয়কে মথিত করবেই।
‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে’ এই লাঞ্ছনার কথা উঠে এসেছে অপূর্ব এক ভঙ্গিমায় ‘পণ্যায়নের ইতিকথা’ গল্পে। আবার ‘সুতানাগ’ গল্পে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের শেষ দুটো টাকা পর্যন্ত ছেনে নেবার জন্য টেনে নেবার জন্য কোম্পানিগুলো যে ফাঁদ ফাঁদে, তা প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ করেছেন গল্পকার।
মানুষ অসহায় জীব। এখানে মানুষের জীবন কখনো কখনো পশুর জীবনের চেয়েও কম হয়ে যায়। ‘লাশের শকট’ গল্পটিতে তেমনই একটা মেসেজ আমরা পাই।
‘বেহুলার দ্বিতীয় বাসর’ অপূর্ব সুন্দর একটা গল্প। এখানে বেহুলাকে ইন্দ্রের সভায় নগ্ন হয়ে নাচার দায়ে লখিন্দর তাকে অস্বীকার করে বসে। এখানে পুরুষের স্বভাবের একটা দিক উঠে যেমন আসে; তেমনভাবে আরও একটা বিষয় উঠে আসে। সেটা হলো, শরীরের চেয়ে মন কোনোভাবেই কম নয় সৎ বা অসৎ হওয়ার ক্ষেত্রে। বইয়ের সবচেয়ে চমৎকার গল্প এটিকেই আমার মনে হয়েছে।
পুরুষ স্বভাবের আরও একটা খারাপ দিক অথবা নারীর অসহায়ত্বের কথা উঠে এসেছে ‘পুরুষ’ গল্পে। ‘একদা চারি বন্ধু…’ উপগল্পটি দুটো গল্পে ব্যবহার হয়েছে, এটা ভালো লাগেনি; ভালো লাগেনি ‘যোজনগন্ধা’ গল্পে শুধু কবিতার খাতা থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার ব্যাপারটিও। কারণ মালতির সাথে মিলেছে তো আরও কেউ কেউ। একান্তই যদি শুধু কবিতার খাতা থেকে দুর্গন্ধের ব্যাপারটা আনতেই হতো, তাহলে অন্যদের মালতির সাথে না জুড়লেই বেশি যুক্তিযুক্ত হতো বলে আমার মনে হয়।
অবশ্য এগুলো তেমন কোনো ত্রুটি নয়; আমার ক্ষুদ্র মাথার সামান্য আপত্তি মাত্র। ভালোবাসা কথাকার জাকির তালুকদারের জন্য।
বইয়ের নাম: প্রিয় ১৫ গল্প
লেখকের নাম: জাকির তালুকদার
প্রকাশনী: ঐতিহ্য
প্রকাশকাল: ২০২৩ সাল
মূল্য: ৪২০ টাকা।
এসইউ
এডমিন 


















