শুরু হচ্ছে এশিয়ার দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবিমেলা’। জানুয়ারির ১৬ তারিখ ঢাকায় উৎসবের ১১তম আসরের পর্দা উঠবে। উৎসব উপলক্ষে ১৬ দিনব্যাপী ঢাকার পাঁচ স্থানে থাকবে প্রদর্শনী। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, দৃকপাঠ ভবন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় থাকবে নয়টি প্রদর্শনী। এ বছর পাঁচ মহাদেশের ১৮টি দেশ থেকে ৫৮ জন শিল্পী অংশ নিচ্ছেন।
আজ (৩ জানুয়ারি) শনিবার সকালে রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উৎসবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে চলমান এ উৎসব বিশ্বের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসবগুলোর অন্যতম।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন উৎসবের প্রধান উপদেষ্টা ড. শহিদুল আলম। জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে ছবিমেলার আয়োজন প্রসঙ্গে কথা বলেন এই আলোকচিত্রশিল্পী। তিনি জানান, শুরু থেকেই ছবিমেলার সামনে ছিল নানান প্রতিবন্ধকতা। সেসব দিনের গল্প বলতে গিয়ে শহিদুল আলম বলেন, ‘১৯৯৪ সালে প্রথম সিদ্ধান্ত নেই ছবিমেলা করার, প্রস্তুতি সম্পন্ন করি ১৯৯৫ সালে। কিন্তু যে সপ্তাহে ছবিমেলা হওয়ার কথা ছিল, সে সপ্তাহেই বাংলাদেশে প্রথম এক-সপ্তাহব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। কীভাবে সামাল দেবো বুঝে উঠতে না পেরে আয়োজন বাতিল করা হয়। পরে নানান বাস্তবতায় আমরা সিদ্ধান্ত নিই যত-যাই হোক, ছবিমেলা করবো। ২০০০ সালে যখন আমরা শুরু করি, উৎসব চলাকালীন একদিন খবর এলো, রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামবে। সেই অবস্থাতেও বিদেশী আলোকচিত্রীদের নিয়ে রাস্তায় নেমেছি, ছবিমেলা হয়েছে। এবারো ছবি মেলা শুরু হতে যাচ্ছে নির্বাচনের আগে।’
শহিদুল আলম আরও বলেন, ‘ছবিমেলার মধ্যদিয়ে কে কার কাজ কীভাবে দেখবে, তা দেখার একটা জায়গা ও ভিন্ন একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। সময়ের সাথে উৎসবের চরিত্র বদলেছে, মেন্টরশিপের মাধ্যমে কীভাবে এই যাত্রাকে জিইয়ে রাখা যায়, পরিকল্পনা সেদিকে এগুচ্ছে। শুরু থেকে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন, পাঠশালার ছাত্র-শিক্ষকরা, তারাই আজ ছবিমেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এবারের উৎসব পরিচালক এএসএম রেজাউর রহমান, কিউরেটর মুনেম ওয়াসিফ ও সরকার প্রতীক, আলোকচিত্রী জান্নাতুল মাওয়া এবং এডুকেশন ডিরেক্টর খন্দকার তানভীর মুরাদ।
এএসএম রেজাউর রহমান বলেন, ‘২০২১ সালে করোনাকালীন বাস্তবতায় আমরা সীমিতভাবে একটি বিশেষ সংস্করণ “শুন্য”-এর আয়োজন করেছিলাম। এবার ১১তম সংস্করণটি পরিপূর্ণভাবে আয়োজিত হছে “পুনঃ” থিমের আলোকে। উপসর্গ “পুনঃ” অর্থ আবার, নতুন করে কিংবা অন্যভাবে শুরু করা। বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশ আমরা সবাই মুখিয়ে আছি নতুন সময়ের জন্য, নতুন করে শুরু করার জন্য, সেই ভাবনা থেকেও আমরা এবার ছবিমেলাকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছি।’
উৎসবের প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করেন মুনেম ওয়াসিফ ও সরকার প্রতীক। মুনেম ওয়াসিফ বলেন, ‘এবারে ছবিমেলার প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে তিনটি জায়গা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখনকার পৃথিবী যে ধরনের সংঘাত ও দুশ্চিন্তার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, সেই ভাবনাকে মাথায় রেখে ‘বাট এ উন্ড দ্যাট ফাইটস’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ঢাকা-গাজা-করাচি-কাশ্মির হয়ে নানান জায়গার টানাপোড়েন ও শিল্পীরা তা কীভাবে দেখছেন, তা উঠে এসেছে; আমন্ত্রিত কিউরেটর তানভি মিশ্রর ‘রাইটস অব প্যাসেজ’ কাজটির মধ্যদিয়ে আমরা দেখবো সীমান্তের ধারনার সূচনা, কীভাবে সীমান্ত মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, কারা এই সীমান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে, এপারে-ওপারে রিফ্যুইজি হয়ে যাওয়া এবং সীমান্ত ঘিরে সংঘাত কীভাবে ইকোসিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকছে ইয়াসমিন ইদ-সাব্বাহ ও লালে বার্গম্যান হোসেন পরিকল্পিত ‘(আন)লার্নিং প্যালেস্টাইন’ — যাতে একটি রিডিং রুম থাকবে, যেখানে ফিলিস্তিনি গল্পগুলোকে বিভিন্ন বই, চিঠি, ইলাস্ট্রেশন, ছবির মধ্যদিয়ে মানুষ ফিলিস্তিনি ইতিহাস জানতে ও বুঝতে পারবে।’
সরকার প্রতীক জানান, উৎসবের মূল প্রদর্শনীস্থল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অ্যাডাম ব্রুমবার্গ, আর্নেস্ট কোল ও সৈয়দ মুহাম্মদ জাকিরের তিনটি কাজ রাখা থাকবে, যার মধ্যে স্থান ও কাজের ভিন্নতা থাকলেও, থাকবে ইতিহাস, মানুষ, পরিবেশের সম্পর্ক।
তারা আরও জানান, এবারের নয় প্রদর্শনীর সমাহারে রয়েছে তিনটি একক প্রদর্শনী, যা উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ। আলেসান্দ্রা সাঙ্গুঁইনেতির ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অব গুইল এবং বেলিন্ডা অ্যান্ড দ্য এনিগম্যাটিক মিনিং অব দেয়ার ড্রিমস’, বানি আবিদির ‘দ্য ম্যান হু টকড আনটিল শি ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ এবং আলোকচিত্রী আমানুল হকের ‘দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টেরিয়ান’। এতে আলোকচিত্রীর তোলা ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধ, বাংলাদেশের নদী ও গ্রামের ছবি থেকে শুরু করে দেখানো হবে সত্যজিৎ রায়ের নানান ছবি।
উৎসবে আরও থাকছে জান্নাতুল মাওয়া ও ছবিমেলার একটি দলের গবেষণা থেকে উঠে আসা ‘উইমেন ইন দ্য জুলাই আপরাইজিং: এসেনশিয়াল দেন – হোয়াই ইরেজড নাউ?’ প্রদর্শনীটি। সম্মেলনে জান্নাতুল মাওয়া তাদের কাজ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বৈষম্য নিরসণে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের গনঅভ্যুত্থান হলো, যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীর অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু পরে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নারীদেরকে রাখা হয়নি। সেই প্রশ্ন থেকেই এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে ২৫ জন আলোকচিত্রীর কাজ দিয়ে নারীদের সেই উপস্থিতি ও অংশগ্রহণকে আবারো তুলে ধরা হচ্ছে, কেননা ছবি দলিলের কাজ করে। এবং বৈষম্যের সংগ্রাম এখনো চলছে, শেষ হয়নি।’
ছবিমেলা ফেলোশিপের সহয়তায় থাকছে প্রদর্শনী — ঢেউ। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমির নয়জন ফেলো-শিল্পীর ইন্টার ডিসিপ্লিনারি, লেন্সভিত্তিক চর্চার মধ্যদিয়ে করা নতুন কাজ তুলে ধরা হবে। এই কাজগুলোর তত্ত্বাবধানে নির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছেন আমন্ত্রিত কিউরেটর সোহরাব জাহান এবং সহায়তা করছে দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।

বিশেষ কর্মশালা, পাবলিক টক, গাইডেড ট্যুর
মেলা উপলক্ষে এ বছর ছয়টি বিশেষায়িত কর্মশালা পরিচালনা করা হবে। পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের পক্ষে সেসবের নেতৃত্বে থাকবেন আমাক মাহমুদিয়ান, অর্ক দত্ত, বানি আবিদি, হাসিব জাকারিয়া, নিকোলাস পল্লি এবং রেনা এফেন্দি। আরও থাকছে ১৬টি পাবলিক টক ও ৪টি গাইডেড ট্যুর। দেশি ও বিদেশি প্রায় ৭০ জন আলোকচিত্রী পোর্টফোলিও রিভিউ করবেন। স্থানীয় স্কুলগুলোকে নিয়ে একটি শিক্ষামূলক প্রচার কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে, যাতে ১৫টি স্কুলের ৫০০-৮০০ শিক্ষার্থী অংশ নেবে। তাদের এবং তাদের শিক্ষকদের বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল নিয়ে বসা হবে যাতে শিশুদের ভিজ্যুয়াল লার্নিংয়ের মধ্যদিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শহিদুল আলম বলেন, ‘ছবিমেলা সবসময় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এসেছে। এবারেও আন্তর্জাতিকভাবে ও নিজের দেশে, ক্ষমতাকে আমরা কতটা প্রশ্ন করছি – তা কাজগুলোতে দেখা যাবে।’
জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখে শুরু হয়ে মেলা চলবে ৩১ তারিখ পর্যন্ত। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব প্রদর্শনী ও আয়োজনে অংশ নিতে পারবেন। এ আয়োজনের উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, নেপালি প্রকাশক, লেখক ও সম্পাদক কুন্দা দীক্ষিত, ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই, অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং মানবাধিকারকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল।
আরএমডি
এডমিন 


















