১১:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গুম ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ: তদন্ত কমিশন

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ০৫:৫২:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • 6

কমিশনের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ। কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা যে ডেটা সংগ্রহ ও যাচাই করেছেন, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়—এগুলো ছিল পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম।

রোববার (৪ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। পাশাপাশি উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার কমিশনের বরাত দিয়ে জানান, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি মামলা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত।

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, এখনো নতুন অভিযোগ আসছে এবং প্রকৃত গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ভিকটিম বা তাঁদের পরিবার কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি—কেউ কমিশনের বিষয়ে জানতেন না, কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন, আবার কেউ অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি বলেও জানান তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের শিকার হয়ে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এখনো যারা নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, একাধিক হাই-প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য গুমের শিকারদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

কমিশনের সদস্যরা আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেক গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের তথ্যও পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয় বলে কমিশনের দাবি।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের কাজকে “ঐতিহাসিক” আখ্যা দিয়ে সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের লেবাস পরে কীভাবে মানুষের ওপর পৈশাচিক আচরণ করা যায়—এই রিপোর্ট তার ডকুমেন্টেশন। এই নৃশংসতা থেকে জাতিকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।”

তিনি রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশমালা দ্রুত উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আয়নাঘরের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের স্থানগুলো ম্যাপিং করার নির্দেশনাও দেন তিনি।

কমিশনের তদন্তে দেখা গেছে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থানের জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাঁর সমর্থন ও সহায়তা ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভিকটিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

সাজু/নিএ

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

স্বতন্ত্র প্রার্থীকে হেনস্তার ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে লিগ্যাল নোটিশ

গুম ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ: তদন্ত কমিশন

আপডেট সময়ঃ ০৫:৫২:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

কমিশনের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ। কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা যে ডেটা সংগ্রহ ও যাচাই করেছেন, তা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়—এগুলো ছিল পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম।

রোববার (৪ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। পাশাপাশি উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার কমিশনের বরাত দিয়ে জানান, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি মামলা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত।

কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, এখনো নতুন অভিযোগ আসছে এবং প্রকৃত গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ভিকটিম বা তাঁদের পরিবার কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি—কেউ কমিশনের বিষয়ে জানতেন না, কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন, আবার কেউ অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি বলেও জানান তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের শিকার হয়ে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এখনো যারা নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, একাধিক হাই-প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য গুমের শিকারদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।

কমিশনের সদস্যরা আরও জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেক গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের তথ্যও পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয় বলে কমিশনের দাবি।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের কাজকে “ঐতিহাসিক” আখ্যা দিয়ে সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের লেবাস পরে কীভাবে মানুষের ওপর পৈশাচিক আচরণ করা যায়—এই রিপোর্ট তার ডকুমেন্টেশন। এই নৃশংসতা থেকে জাতিকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।”

তিনি রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশমালা দ্রুত উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আয়নাঘরের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের স্থানগুলো ম্যাপিং করার নির্দেশনাও দেন তিনি।

কমিশনের তদন্তে দেখা গেছে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থানের জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাঁর সমর্থন ও সহায়তা ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভিকটিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

সাজু/নিএ