রমজান, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার তারিখ নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই বিভিন্ন দেশে মতপার্থক্য দেখা যায়। প্রতি বছর দেশ ও অঞ্চলভেদে রমজান ও ঈদের তারিখ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ঘোষণা আসে। কোথাও এক দিন আগে, আবার কোথাও এক দিন পরে রোজা বা ঈদ শুরু হয়। এর পেছনে মূল কারণ একটিই। আর তাহলো চাঁদ দেখার পদ্ধতিতে ভিন্নতা। হিজরি মাস শুরুর তারিখ নির্ধারণে মুসলিম দেশগুলোতে চার ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
হিজরি বা ইসলামী ক্যালেন্ডার পুরোপুরি চন্দ্রভিত্তিক। এই ক্যালেন্ডারের প্রতিটি মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ বা হিলাল দেখার মাধ্যমে। আরবি মাসগুলো ২৯ অথবা ৩০ দিনের হয়ে থাকে। প্রতি মাসের ২৯তম দিনে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে চাঁদ দেখা গেলে পরদিন থেকেই নতুন মাস শুরু হয়। আর চাঁদ দেখা না গেলে মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে পরদিন নতুন মাস শুরু হয়।
তবে প্রশ্ন হলো, এই চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কীভাবে? এ ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে মূলত চারটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
১. স্থানীয়ভাবে খালি চোখে চাঁদ দেখা
এই পদ্ধতিতে মানুষ সরাসরি আকাশে নতুন চাঁদ দেখার চেষ্টা করে। মাগরিবের পর পশ্চিম আকাশে খালি চোখে বা কখনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে চাঁদ দেখা গেলে তা সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। যাচাই শেষে সরকার বা ইসলামী সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়। অনেক দেশ এখনো এই পদ্ধতিকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মনে করে।
২. জ্যোতির্বিদ্যার হিসাব বা গণনা পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে চাঁদের অবস্থান নির্ণয় করা হয়। চাঁদ ও সূর্যের সংযোগ সময়, চাঁদের উচ্চতা, দৃশ্যমানতার সম্ভাবনা—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মাস শুরুর দিন ঠিক করা হয়। সিঙ্গাপুর এর একটি বাস্তব উদাহরণ। সেখানে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকা ও প্রায়ই মেঘলা আকাশের কারণে সরাসরি চাঁদ দেখা কঠিন। ফলে ১৯৭৪ সাল থেকেই দেশটি হিসাবভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
৩. অন্য দেশের ঘোষণা অনুসরণ
কিছু দেশ বা অঞ্চলে নিজস্ব চাঁদ দেখার ব্যবস্থা না থাকলে তারা অন্য কোনো দেশের ঘোষণার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত নিকটবর্তী মুসলিম দেশ বা মক্কার চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয়।
অ্যান্টার্কটিকার মতো জায়গায় স্থায়ী মুসলিম জনগোষ্ঠী বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান না থাকায় সেখানে অবস্থানরত মুসলমানরা এই পদ্ধতিতে ইবাদতের সময়সূচি নির্ধারণ করেন।
৪. সমন্বিত বা হাইব্রিড পদ্ধতি
এই পদ্ধতিতে জ্যোতির্বিদ্যার হিসাব ও বাস্তব চাঁদ দেখা, দুটিই একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। আগে হিসাব করে দেখা হয় চাঁদ দেখা আদৌ সম্ভব কি না। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষকরা আকাশে চাঁদ খোঁজেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই।
ব্যতিক্রমী একটি দিক
হজ পালনকারীদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আরাফাতের ময়দানে অবস্থান হজের মূল অংশ এবং তা জিলহজ মাসের ৯ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়, তাই হজের সব আনুষ্ঠানিকতা সৌদি আরবের জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সম্পন্ন করতে হয়।
হিজরি বর্ষপঞ্জির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাস
যদিও প্রতি মাসেই চাঁদ দেখা হয়, তবে কয়েকটি মাসের চাঁদের ঘোষণা মুসলমানদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এই মাসগুলোর মধ্যে রমজান মাস অন্যতম। কারণ, রমজান মাসে রোজা শুরু ও শেষের বিষয়টি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাওয়াল মাসের চাঁদও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর পালিত হয়।
জিলহজ মাসের চাঁদও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই মাসে আরাফার দিন, ঈদুল আজহা ও হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয় চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে।
মুহাররম মাস ইসলামী বছরের প্রথম মাস, এর দশ তারিখ আশুরা পালিত হয়।
রবিউল আউয়াল মাসে পালিত হয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন।
দেশভেদে তারিখ ভিন্ন হয় কেন?
আবহাওয়া, মেঘাচ্ছন্নতা, ভৌগোলিক অবস্থান, সময় ও অঞ্চলের পার্থক্যের কারণে এক দেশে চাঁদ দেখা গেলেও অন্য দেশে নাও দেখা যেতে পারে। একই সন্ধ্যায় কোথাও চাঁদ দৃশ্যমান, কোথাও অদৃশ্য থাকেএ কারণেই রোজা বা ঈদের তারিখে পার্থক্য দেখা যায়।
চাঁদ কারা দেখেন?
অধিকাংশ মুসলিম দেশে সরকার বা ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে বিশেষ কমিটি থাকে। প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবীরা উঁচু স্থান বা খোলা দিগন্তে গিয়ে চাঁদ দেখার চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিদরাও সহায়তা করেন। সব তথ্য যাচাই শেষে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে চাঁদ দেখার কাজে অংশ নেয় আল খাতিম, জাবাল হাফিত, দুবাই, শারজাহ ও রাস আল খাইমাহর জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো।
২০২৫ সালে আমিরাতে প্রথমবারের মতো ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শাওয়ালের চাঁদ দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা বিশ্বে নজির সৃষ্টি করে।
সূত্র : খালিজ টাইমস।
মাসুম/সাএ
এডমিন 



















