হঠাৎ খেয়াল করলেন ফোনটা পাশে নেই। সঙ্গে সঙ্গে বুক ধড়ফড় শুরু হলো, মনে হলো কিছু একটা মিস হয়ে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে খুঁজছেন ফোন – না পেলে অস্থিরতা, বিরক্তি, এমনকি রাগও চলে আসছে। বিষয়টা কি শুধু অভ্যাস, নাকি এর পেছনে আছে কোনো মানসিক সমস্যা?
এই অবস্থার নামই নোমোফোবিয়া – অর্থাৎ মোবাইল ফোন ছাড়া থাকার ভয়।
নোমোফোবিয়া আসলে কী?
নোমোফোবিয়া কোনো আনুষ্ঠানিক মানসিক রোগ হিসেবে এখনো তালিকাভুক্ত নয়। তবে মনোবিজ্ঞানীরা একে টেকনোলজি সম্পর্কিত উদ্বেগজনিত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছেন। সহজভাবে বললে, ফোন হাতে না থাকলে বা নেটওয়ার্ক না থাকলে যে অস্বস্তি, ভয় বা অস্থিরতা তৈরি হয় – সেটাই নোমোফোবিয়া।
ফোন না থাকলেই কেন এমন অস্বস্তি হয়?
স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি আমাদের কাজ, পরিচয়, বিনোদন, এমনকি নিরাপত্তাবোধের অংশ হয়ে গেছে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, ফোন আমাদের মস্তিষ্কে একটি ডোপামিন-রিওয়ার্ড সাইকেল তৈরি করে। নোটিফিকেশন, মেসেজ, লাইক – সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক বারবার ফোন চেক করতে চায়। ফোন না থাকলে সেই রিওয়ার্ড বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তৈরি হয় উদ্বেগ।
নোমোফোবিয়ার সাধারণ লক্ষণ
সবার ক্ষেত্রে লক্ষণ এক রকম হয় না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো –
>> ফোন হাতে না থাকলে বুক ধড়ফড় করা
>> ফোনের চার্জ কমে গেলে অস্বাভাবিক দুশ্চিন্তা
>> নেটওয়ার্ক না থাকলে রাগ বা অস্থিরতা
>> ঘুমানোর সময়ও ফোন পাশে না রাখলে অস্বস্তি
>> বাস্তব কথোপকথনের চেয়ে ফোনে বেশি নিরাপদ বোধ করা
এই লক্ষণগুলো যদি দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে নোমোফোবিয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। কারণ –
>> সোশ্যাল মিডিয়ায় ফোমো বা ফিয়ার অব মিসিং আউট
>> অনলাইন পরিচয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
>> মানসিক চাপ থেকে পালানোর সহজ উপায় হিসেবে ফোন ব্যবহার করা
তবে শুধু তরুণরাই নয় – কাজের চাপ, একাকীত্ব বা দীর্ঘদিনের উদ্বেগ থাকলে যেকোনো বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারেন।
নোমোফোবিয়া কি বিপজ্জনক?
নিজে নিজে ফোন ব্যবহার উপভোগ করা সমস্যা নয়। কিন্তু যখন ফোন ছাড়া থাকা মানেই মানসিক অস্থিরতা, তখন সেটি উদ্বেগজনিত সমস্যা বাড়াতে পারে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে ও পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াতে পারে।
অর্থাৎ, এটি ছোট মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বের হওয়া যায়?
নোমোফোবিয়া থেকে বের হওয়ার প্রথম ধাপ হলো – এটি যে একটি সমস্যা, তা স্বীকার করা। এরপর ধীরে ধীরে অভ্যাস বদলানো জরুরি। যেভাবে শুরু করবেন –
>> নির্দিষ্ট সময় ফোন ব্যবহার না করার অভ্যাস গড়ে তুলুন
>> ঘুমানোর সময় ফোন দূরে রাখুন
>> নোটিফিকেশন সীমিত করুন
>> বাস্তব কাজ, হাঁটা, বই পড়ার মতো অফলাইন অভ্যাস বাড়ান
>> প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সহায়তা নিন
ফোন আমাদের জীবন সহজ করেছে – এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ফোন যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন থামা জরুরি।
সূত্র: আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ, জার্নাল অব বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশনস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
এএমপি/জেআইএম
এডমিন 















