০৯:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যে কারণে তেলের দাম আপনার ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ১২:০৬:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
  • 2

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব এখন ধীরে ধীরে বিশ্বের নানা প্রান্তে অনুভূত হতে শুরু করেছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে থাকা মানুষ এই প্রভাব টের পাবে।

সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে ও উৎপাদনকারীরা উৎপাদন কমাতে শুরু করায় সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের দিকে উঠে গেছে। এতে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, পাম্পে জ্বালানির দাম বেড়েছে ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কাও বাড়ছে।

এই যুদ্ধ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিশ্ব এখনো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অতীতে ১৯৫০ ও ১৯৭০ এর দশকে যে ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা গিয়েছিল, তার কথাও নতুন করে সামনে এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার পরিস্থিতির প্রভাব আরও বড়।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে ওই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও নরওয়ের মতো দেশের তেল ও গ্যাস উৎপাদকদের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত।

স্থানীয় তেল পাইপলাইনগুলো বিকল্প পথ হিসেবে কিছুটা সক্ষমতা রাখলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে ওই অঞ্চলের উৎপাদকরা উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে উৎপাদন ৬০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও উৎপাদন কমাচ্ছে।

জ্বালানি সংকট শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক হামলার কারণে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করার পর বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশও কমে গেছে।

এই ঘাটতি দ্রুত পূরণের সহজ কোনো উপায় নেই। জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এশিয়া ও ইউরোপে ‘দৃষ্টিগ্রাহ্য জ্বালানি সংকট’ দেখা দিতে পারে।

এশিয়া, যেখানে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে কিছু সরকার এরই মধ্যে মূল্যসীমা নির্ধারণ ও রেশনিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভসও মূল্যস্ফীতির বড় ধাক্কার আশঙ্কার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

সংকট কমাতে কিছু দেশ কৌশলগত তেল মজুত ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব সীমিত হবে। র‍্যাপিড এনার্জি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ম্যাক্রো এনার্জি বিশ্লেষক হান্টার কর্নফেইন্ড বলেন, বাজারের চাহিদার তুলনায় এ ধরনের মজুত ছাড়ার পরিমাণ হবে ‘অত্যন্ত সামান্য’।

তিনি বলেন, আধুনিক বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সরবরাহ ধাক্কা। প্রয়োজনের তুলনায় যে পরিমাণ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, তা একেবারেই তুলনাহীন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

জ্বালানির দাম বাড়ছে

এই সরবরাহ ধাক্কার তাৎক্ষণিক প্রভাব হচ্ছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট- দুটোর দামই দ্রুত বেড়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) এক পর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়, পরে কমে আবার ১০০ এর নিচে নেমে আসে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের খরচে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও, যেখানে দেশটি নিজেই বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদক হওয়ায় বৈশ্বিক মূল্য ওঠানামার প্রভাব তুলনামূলক কম পড়ে, সেখানে পাম্পে জ্বালানির দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৩ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছে। এক মাস আগে যা ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯০ ডলার। এটি আবার ২০২৪ সালের দামের কাছাকাছি অবস্থানে ফিরে গেছে।

গত সপ্তাহে গোল্ডম্যান স্যাকস হিসাব করে দেখিয়েছে, তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি মাসের শেষ নাগাদ সংঘাতের সমাধান না হয়, তাহলে বৈশ্বিক তেলের দাম ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল, তার চেয়েও বেশি হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে।

কর্নফেইন্ড বলেন, তখন অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে ‘অত্যন্ত কঠিন’। কারণ জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে, ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ধীর হয়ে পড়বে।

প্রযুক্তি খাত থেকে কৃষি- সবখানেই প্রভাব

বিশ্লেষকরা এরই মধ্যে সতর্কভাবে নজর রাখছেন, এই জ্বালানি সংকট চিপ উৎপাদনে প্রভাব ফেলে কি না। কারণ বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনের বড় কেন্দ্র তাইওয়ান জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রেও উদ্বেগ রয়েছে যে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর খরচ বেড়ে যেতে পারে। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

শুধু জ্বালানি নয়, অন্য পণ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্য অ্যালুমিনিয়াম, সালফার, যা তামার মতো ধাতু প্রক্রিয়াজাতে ব্যবহৃত হয় ও ইউরিয়ার মতো সার উপাদানের বড় উৎস। এসব পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করলে খাদ্য ও উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ সার আমদানি হয়, কারণ এ সময় চাষাবাদ মৌসুম শুরু হয়, এমন তথ্য দিয়েছে আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশন।

দক্ষিণ ক্যারোলিনার কৃষক হ্যারি অট, যিনি তুলা, ভুট্টা ও সয়াবিন চাষ করেন, বলেন পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ সময়ে আসতে পারত না। তিনি গত সপ্তাহে তার সার সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে মাঠে সার প্রয়োগ শুরু করতে পারেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়, যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটি বিক্রি ও সরবরাহ স্থগিত রেখেছে।

পরে প্রতিষ্ঠানটি সারমূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। অটের আশঙ্কা, এতে তার প্রতি একর জমিতে সার খরচ প্রায় ১০০ ডলার বেড়ে যাবে এবং এ বছরের ফসল থেকে কোনো লাভ করার সুযোগই থাকবে না।

তিনি বলেন, এটি খুব কঠিন সময়। সার নিয়ে এখন যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি, তা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল। ফার্ম ব্যুরোর আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কারও হিসাবপত্রে এই অতিরিক্ত খরচ সামলানোর জায়গা ছিল না।

রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এশিয়া ও ইউরোপে, কারণ এ অঞ্চলগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শেয়ারবাজারেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রধান শেয়ার সূচক যুদ্ধ শুরুর পর যথাক্রমে প্রায় ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ কমে গেছে। জার্মানির ড্যাক্স সূচকও ৭ শতাংশের বেশি নেমে গেছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ।

তবে নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় এরই মধ্যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি মূল্যবৃদ্ধির চাপ ভোক্তাদের ওপর পড়তে শুরু করে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

হোয়াইট হাউজ অঞ্চলটি নিয়ে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে কখনো ভিন্ন ভিন্ন সংকেত দিয়েছে, ফলে প্রেসিডেন্ট দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যেতে আগ্রহী কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, ট্রাম্প যদি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেন তবুও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক নাও হতে পারে। কারণ নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে দাম উঁচু রাখতে পারে।

স্যানকি রিসার্চের পল স্যানকি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো অভিযান শেষ ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু ইরান হয়তো বিষয়টিকে সেভাবে দেখবে না।তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন শত্রুতার সমাপ্তি ঘোষণা করলেও বাস্তবে এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

যে কারণে তেলের দাম আপনার ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ

যে কারণে তেলের দাম আপনার ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট সময়ঃ ১২:০৬:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাব এখন ধীরে ধীরে বিশ্বের নানা প্রান্তে অনুভূত হতে শুরু করেছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে থাকা মানুষ এই প্রভাব টের পাবে।

সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে ও উৎপাদনকারীরা উৎপাদন কমাতে শুরু করায় সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের দিকে উঠে গেছে। এতে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, পাম্পে জ্বালানির দাম বেড়েছে ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কাও বাড়ছে।

এই যুদ্ধ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানি সরবরাহের জন্য বিশ্ব এখনো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অতীতে ১৯৫০ ও ১৯৭০ এর দশকে যে ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা গিয়েছিল, তার কথাও নতুন করে সামনে এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার পরিস্থিতির প্রভাব আরও বড়।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে ওই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও নরওয়ের মতো দেশের তেল ও গ্যাস উৎপাদকদের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত।

স্থানীয় তেল পাইপলাইনগুলো বিকল্প পথ হিসেবে কিছুটা সক্ষমতা রাখলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে ওই অঞ্চলের উৎপাদকরা উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে উৎপাদন ৬০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও উৎপাদন কমাচ্ছে।

জ্বালানি সংকট শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক হামলার কারণে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করার পর বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশও কমে গেছে।

এই ঘাটতি দ্রুত পূরণের সহজ কোনো উপায় নেই। জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে এক সপ্তাহের মধ্যেই এশিয়া ও ইউরোপে ‘দৃষ্টিগ্রাহ্য জ্বালানি সংকট’ দেখা দিতে পারে।

এশিয়া, যেখানে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে কিছু সরকার এরই মধ্যে মূল্যসীমা নির্ধারণ ও রেশনিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভসও মূল্যস্ফীতির বড় ধাক্কার আশঙ্কার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

সংকট কমাতে কিছু দেশ কৌশলগত তেল মজুত ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব সীমিত হবে। র‍্যাপিড এনার্জি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ম্যাক্রো এনার্জি বিশ্লেষক হান্টার কর্নফেইন্ড বলেন, বাজারের চাহিদার তুলনায় এ ধরনের মজুত ছাড়ার পরিমাণ হবে ‘অত্যন্ত সামান্য’।

তিনি বলেন, আধুনিক বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড় সরবরাহ ধাক্কা। প্রয়োজনের তুলনায় যে পরিমাণ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, তা একেবারেই তুলনাহীন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

জ্বালানির দাম বাড়ছে

এই সরবরাহ ধাক্কার তাৎক্ষণিক প্রভাব হচ্ছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট- দুটোর দামই দ্রুত বেড়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) এক পর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়, পরে কমে আবার ১০০ এর নিচে নেমে আসে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের খরচে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও, যেখানে দেশটি নিজেই বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদক হওয়ায় বৈশ্বিক মূল্য ওঠানামার প্রভাব তুলনামূলক কম পড়ে, সেখানে পাম্পে জ্বালানির দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৩ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছে। এক মাস আগে যা ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯০ ডলার। এটি আবার ২০২৪ সালের দামের কাছাকাছি অবস্থানে ফিরে গেছে।

গত সপ্তাহে গোল্ডম্যান স্যাকস হিসাব করে দেখিয়েছে, তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি মাসের শেষ নাগাদ সংঘাতের সমাধান না হয়, তাহলে বৈশ্বিক তেলের দাম ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল, তার চেয়েও বেশি হতে পারে। কিছু পরিস্থিতিতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে।

কর্নফেইন্ড বলেন, তখন অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে ‘অত্যন্ত কঠিন’। কারণ জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হবে, ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি ধীর হয়ে পড়বে।

প্রযুক্তি খাত থেকে কৃষি- সবখানেই প্রভাব

বিশ্লেষকরা এরই মধ্যে সতর্কভাবে নজর রাখছেন, এই জ্বালানি সংকট চিপ উৎপাদনে প্রভাব ফেলে কি না। কারণ বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনের বড় কেন্দ্র তাইওয়ান জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রেও উদ্বেগ রয়েছে যে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর খরচ বেড়ে যেতে পারে। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

শুধু জ্বালানি নয়, অন্য পণ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্য অ্যালুমিনিয়াম, সালফার, যা তামার মতো ধাতু প্রক্রিয়াজাতে ব্যবহৃত হয় ও ইউরিয়ার মতো সার উপাদানের বড় উৎস। এসব পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করলে খাদ্য ও উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রায় ২৫ শতাংশ সার আমদানি হয়, কারণ এ সময় চাষাবাদ মৌসুম শুরু হয়, এমন তথ্য দিয়েছে আমেরিকান ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশন।

দক্ষিণ ক্যারোলিনার কৃষক হ্যারি অট, যিনি তুলা, ভুট্টা ও সয়াবিন চাষ করেন, বলেন পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ সময়ে আসতে পারত না। তিনি গত সপ্তাহে তার সার সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে মাঠে সার প্রয়োগ শুরু করতে পারেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়, যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটি বিক্রি ও সরবরাহ স্থগিত রেখেছে।

পরে প্রতিষ্ঠানটি সারমূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। অটের আশঙ্কা, এতে তার প্রতি একর জমিতে সার খরচ প্রায় ১০০ ডলার বেড়ে যাবে এবং এ বছরের ফসল থেকে কোনো লাভ করার সুযোগই থাকবে না।

তিনি বলেন, এটি খুব কঠিন সময়। সার নিয়ে এখন যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি, তা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল। ফার্ম ব্যুরোর আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কারও হিসাবপত্রে এই অতিরিক্ত খরচ সামলানোর জায়গা ছিল না।

রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এশিয়া ও ইউরোপে, কারণ এ অঞ্চলগুলো জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শেয়ারবাজারেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রধান শেয়ার সূচক যুদ্ধ শুরুর পর যথাক্রমে প্রায় ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ কমে গেছে। জার্মানির ড্যাক্স সূচকও ৭ শতাংশের বেশি নেমে গেছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ।

তবে নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় এরই মধ্যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি মূল্যবৃদ্ধির চাপ ভোক্তাদের ওপর পড়তে শুরু করে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

হোয়াইট হাউজ অঞ্চলটি নিয়ে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে কখনো ভিন্ন ভিন্ন সংকেত দিয়েছে, ফলে প্রেসিডেন্ট দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যেতে আগ্রহী কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, ট্রাম্প যদি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেন তবুও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক নাও হতে পারে। কারণ নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে দাম উঁচু রাখতে পারে।

স্যানকি রিসার্চের পল স্যানকি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো অভিযান শেষ ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু ইরান হয়তো বিষয়টিকে সেভাবে দেখবে না।তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন শত্রুতার সমাপ্তি ঘোষণা করলেও বাস্তবে এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ