নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার ০.৫ শতাংশে সীমিত রাখা এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কমাতে এমএফএস এর মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ফেরতের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ ও বাণিজ্যবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ)।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির পক্ষে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রাক বাজেট আলোচনায় প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা। এসময় আরও বক্তব্য দেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম, সহসাধারণ সম্পাদক মানিক মুনতাছির।
এসময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের মধ্যে যাদের আয় বার্ষিক কোটি টাকার ওপরে তাদের আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর বসানোর কথা ভাবছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
তিনি বলেন, ডিসপ্যারিটি কমানোর জন্য এনবিআরের কাছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র যে ইনকাম ট্যাক্স কালেকশন বাড়ানো। অন্য দেশে কিন্তু ৪৫, ৫০, ৫৫ পার্সেন্ট পর্যন্ত ইন্ডিভিজুয়াল মার্জিনাল ইনকাম ট্যাক্স রেট। আমাদের দেশেও এটা ৬০ পার্সেন্ট পর্যন্ত ছিল আশির দশকে।
তিনি বলেন, আমরা সেটা কমাতে কমাতে অনেক কমিয়ে ফেলেছি এবং এটা সবার জন্য না, এটা যারা সুপার ইনকাম করেন অনেক বেশি আয় করেন বছরে কোটি টাকা ইনকাম করেন তাদের জন্য। কোটি টাকার উপরে আমার মনে হয় আমরা আরও ৫ পার্সেন্ট ট্যাক্স রেট বাড়াতে পারি ২০২৭-২৮ (করবর্ষ) এর জন্য।
এছাড়া রাজস্ব বাড়াতে সিগারেটের দাম বৃদ্ধি, তামাকজাত পণ্যে নতুন স্কিম প্রণয়ন ও কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। একইসঙ্গে চোরাচালান ও জাল স্ট্যাম্পের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে জব্দকৃত পণ্য জনসমক্ষে ধ্বংস করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া চোরাই সিগারেট বন্ধে উন্নত বিশ্বের মতো সিগারেটে প্যাকেটে কিআর কোড সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত মানুষের উপর করের চাপ কমানোসহ ৩২ টি প্রস্তাব দিয়েছে ইআরএফ।
প্রস্তাবগুলো হল-
১. মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের উপর করের চাপ কমাতে এমএফএস এর মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ফেরতের ব্যবস্থা করা এবং যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের ব্যাংক সুদের উপর কর্তিত কর ফেরত প্রদান।
২. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার ০.৫ শতাংশে সীমিত রাখা।
৩. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে পৃথক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং সহজে বন্ড সুবিধা প্রদান।
৪. বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড করমুক্ত রাখা।
৫. কর-জিডিপি হার নিয়ে এনবিআর-ইআরএফ যৌথ জরিপ চালু করা।
৬. ব্যক্তি করদাতার সর্বোচ্চ করহার ৩০-৩৫ শতাংশ নির্ধারণ।
৭. ভ্যাটের একক হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ।
৮. বাজারমূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পদ কর আদায়।
৯. প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার করহার কমানো।
১০. এনবিআরের তিনটি বিভাগের জন্য পৃথক হেল্পলাইন চালু।
১১. কাস্টমসের টাইম রিলিজ স্টাডির মতো আয়কর ও ভ্যাটে একই ধরনের স্টাডি পরিচালনা।
১২. বিনিয়োগকারী ও করদাতাদের সহায়তায় এনবিআরের তিন বিভাগে ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ।
১৩. চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও মোংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নারীবান্ধব করা।
১৪. জেলা ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক মিডিয়াম ট্যাক্সপেয়ার ইউনিট (এমটিইউ) গঠন।
১৫. করছাড় প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ক্ষতির প্রাক্কলন প্রকাশ।
১৬. মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা।
১৭. এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রেক্ষিতে আমদানি শুল্ক কাঠামো ধীরে ধীরে কমানো।
১৮. অনিবাসীদের সেবার ওপর উৎসে করহার পুনর্বিবেচনা।
১৯. এনবিআরের সব নীতিনির্ধারণে ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস চালু করা।
২০. গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগ আধুনিকায়নে বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ।
২১. ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ও মুনাফার কর হ্রাস বা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত প্রত্যাহার।
২২. ঋণ অনুমোদনের আগে এনবিআর ডাটাবেজ থেকে ব্যবসায়িক তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা।
২৩. এনবিআর ভবনে একটি মিডিয়া সেন্টার স্থাপন।
২৪. ইআরএফ-এনবিআর রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড চালু করা।
২৫. প্রতি প্রান্তিকে ইআরএফ সদস্যদের সঙ্গে এনবিআরের বৈঠক আয়োজন।
২৬. করযোগ্য জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে জাতীয় জরিপ পরিচালনা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
২৭. ট্রান্সফার প্রাইসিং আইনের কার্যকারিতা জোরদার করে অর্থ পাচার রোধ।
২৮. পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহে কর্পোরেট করের ব্যবধান কমপক্ষে ৫ শতাংশ রাখা।
২৯. দেশে কোটি টাকার উপর একাউন্টহোল্ডার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কর পরিশোধ করছে কি-না, তা যাচাই করা।
৩০. সারাদেশে ৫ তলার বা তার অধিক উচ্চতার সকল ভবন মালিককে বাধ্যতামুলকভাবে কর নেটের আওতায় আনা। অর্থাৎ, ৫ তলা বাড়ি থাকলেই তার জন্য কর দেওয়া বাধ্যতামুলক করা।
৩১. মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানী আমদানিতে প্রায় দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে উচ্চমূল্যের জ্বালানি থেকে রাজস্ব আহরণও বাড়ছে। এ অবস্থায় জ্বালানীর আমদানি ব্যয় সহনীয় রাখতে বাড়তি রাজস্ব আহরণ ছাড় দেওয়া যেতে পারে।
৩২. দেশে উৎপাদিত অবৈধ সিগারেট থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। অবৈধ সিগারেট উৎপাদকদের করের আওতায় আনা অথবা সেগুলো বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
ইএইচটি/এমএসএম
এডমিন 








