চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের দায়িত্বকালেই এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত ৫৪৭ দিনে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৪২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি নিয়োগের নজির নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, মাত্র পাঁচটি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে এসব নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়। প্রতিটি সভায় গড়ে প্রায় ৮৫ জনের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়াও একুশে ফেব্রুয়ারির মতো জাতীয় ছুটির দিনেও সিন্ডিকেট বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে নিয়োগ বোর্ড গঠন থেকে শুরু করে নীতিমালা পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। উপ-উপাচার্যের মেয়ে, আরেক উপ-উপাচার্যের সহগবেষক, রেজিস্ট্রারের ভাই এবং হল প্রভোস্টদের পরিবারের সদস্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
এছাড়া বাংলা বিভাগের পরিকল্পনা কমিটি শিক্ষক প্রয়োজন নেই বলে মত দিলেও সেখানে একসঙ্গে সাতজন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। একইভাবে ক্রিমিনোলজি বিভাগে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নৃবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একাধিকবার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে চিঠি দেয়। একইসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দুদকের চট্টগ্রাম-১ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্ত ৪২৫ জনের মধ্যে শিক্ষক ১২২ জন (২৯ শতাংশ), কর্মকর্তা ২২ জন (৫ শতাংশ) এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ২৮১ জন (৬৬ শতাংশ)। শিক্ষকদের মধ্যে ৮১ জন নতুন এবং ৩১ জনকে অস্থায়ী থেকে স্থায়ী করা হয়েছে।
এদিকে নিয়োগ বোর্ড গঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষককে বাদ দিয়ে অন্য বিভাগ বা বাইরের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফাইন্যান্স বিভাগে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীমের নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, মেধাতালিকায় পিছিয়ে থাকলেও বোর্ড গঠনের মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও তিনি দাবি করেছেন, মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ পেয়েছেন।
এদিকে কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগের যোগ্যতার মানদণ্ড শিথিল করার অভিযোগও উঠেছে। আগে যেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০ প্রয়োজন ছিল, তা কমিয়ে ৩.৪০ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগের বিষয়ে বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের মতামত জানতে চাইলে একাধিক কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্বের নিয়োগ নিয়ে অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। সেখানে কোনো প্রকার দুর্নীতি প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মোস্তাফিজুর রহমান/এফএ/এএসএম
এডমিন 














