মেট গালার লাল গালিচা বরাবরই ফ্যাশনের সবচেয়ে সাহসী পরীক্ষাগার। সেখানে পোশাক শুধু পোশাক থাকে না, হয়ে ওঠে ইতিহাস, শিল্প আর ব্যক্তিগত গল্পের মিশেল। এবারের মেট গালা থিম ছিল ‘কস্টিউম আর্ট’, ড্রেসকোড হিসেবে নির্ধারিত ছিল ‘ফ্যাশন ইজ আর্ট’, আর সেই ধারণাকেই যেন শরীরী ক্যানভাসে পরিণত করলেন বলিউড পরিচালক করণ জোহর, তার প্রথম মেট গালা উপস্থিতিতে।
এই রাজকীয় উপস্থিতির পেছনে ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রা, যিনি ফ্যাশনকে প্রায়শই গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং তিনি ফ্যাশনকে সরাসরি চিত্রকলার স্তরে নিয়ে গেছেন।
এই লুকের কেন্দ্রবিন্দু ছিল উনিশ শতকের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মার পেইন্টিং। ভারতের ঐতিহ্যবাহী আর্ট অ্যান্ড কালচার থেকে বেছে নেওয়া এই মোটিফগুলো শুধু নকশা নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক।
মনীশ মালহোত্রা করণের জন্য যে অনসম্বল তৈরি করেন, তা ছিল যেন চলমান একটি আর্ট গ্যালারি। ৬ ফুট লম্বা কেপে রাজা রবি বর্মার চিত্রকর্ম হাতে আঁকা ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তোলা হয়। কেপটি শুধু একটি অ্যাক্সেসরি নয়; এটি ছিল পুরো লুকের কেন্দ্রবিন্দু, যেন একটি জীবন্ত ক্যানভাস, যা হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে গল্প বলে।
এই কেপ ও পোশাকের প্রতিটি স্তরে ছিল সূক্ষ্ম জারদৌসি কাজ। সোনালি সুতোয় বোনা নকশা পুরো লুককে দিয়েছে রাজকীয় এক আভিজাত্য। পেইন্টিং মোটিফগুলোর মাঝে মাঝে ব্যবহৃত হয়েছে জারদৌসির অলংকরণ, যা শিল্প আর হস্তশিল্পের এক অসাধারণ সংলাপ তৈরি করেছে। এই মিশ্রণেই তৈরি হয়েছে এক নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা, যেখানে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্প আধুনিক গ্লোবাল ফ্যাশন প্ল্যাটফর্মে নতুন পরিচয় পাচ্ছে।
পুরো আউটফিটের বেস ছিল গভীর কালো রঙের। নিচের অংশে রাখা হয়েছে মিনিমাল কিন্তু শক্তিশালী কালো প্লেন, যা উপরের ভারী আর্টওয়ার্ককে আরও বেশি উজ্জ্বল করে তোলে।
ভেতরের প্রিন্স কোটেও ব্যবহৃত হয়েছে কালো ফেব্রিক, যার উপর সোনালি সূচিকর্ম লুকটিকে দিয়েছে এক ধরণের রাজসিক ভারসাম্য। এই কনট্রাস্ট শুধু নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ভিজ্যুয়াল স্টেটমেন্ট, যেখানে নীরবতা (কালো) আর জাঁকজমক (সোনালি) একসাথে সহাবস্থান করে।
মনীশ মালহোত্রা এই লুককে কোনো সাধারণ পোশাক হিসেবে তৈরি করেননি। তিনি একে উপস্থাপন করেছেন একটি ‘ক্যানভাস’ হিসেবে। এখানে কাপড়, রং, সূচিকর্ম সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছে একটি জীবন্ত শিল্পকর্ম, যা লাল গালিচায় হাঁটার সময় প্রতিটি ফ্রেমে নতুন গল্প তৈরি করে। করণ জোহরের এই উপস্থিতি তাই শুধু একটি সেলিব্রিটি এন্ট্রি নয়, বরং ভারতীয় শিল্প ঐতিহ্যের এক বৈশ্বিক প্রদর্শনী।
মেট গালার মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজা রবি বর্মার চিত্রকলা ব্যবহার করা শুধু ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নয়, এটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বও। ভারতীয় ক্লাসিক আর্টকে আধুনিক ফ্যাশনের ভাষায় রূপান্তর করে মনীশ মালহোত্রা দেখিয়েছেন, ঐতিহ্য কখনো পুরনো হয় না; বরং নতুন রূপে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।
জেএস/
এডমিন 















