০৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান কি হরমুজ প্রণালিতে টোল বসাতে পারে, কী বলে আন্তর্জাতিক আইন?

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
  • 3

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ করে দেয় ইরান। সম্প্রতি প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। তবে তাদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কতটা বৈধ—তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কী?

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। এটি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। প্রণালিটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। বিশ্বে মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

হরমুজ প্রণালির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার (১০৪ মাইল)। প্রস্থ বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন হলেও সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে জাহাজের প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য দুই মাইল করে আলাদা চ্যানেল রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দুই মাইলের একটি বাফার জোন।

আরও পড়ুন>>
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অনিশ্চিত, বন্ধই থাকছে হরমুজ প্রণালি

হরমুজে ভারতীয় ট্যাংকারে ইরানের গুলি, পিছু হটলো ২ জাহাজ
যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’ ইরান

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয় এবং যুদ্ধ শেষের শর্ত হিসেবে জাহাজ থেকে টোল আদায়ের অধিকার দাবি করে। তবে এখন পর্যন্ত বাস্তবে টোল আদায় শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কোন আইনে প্রণালি নিয়ন্ত্রিত হয়?

১৯৮২ সালে গৃহীত এবং ১৯৯৪ সাল থেকে কার্যকর জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী, বিশ্বের ১০০টির বেশি প্রণালির মতো হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজের ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা বাধাহীন চলাচলের অধিকার রয়েছে।

এই সনদ অনুযায়ী, কোনো প্রণালির তীরবর্তী দেশ তার ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২ দশমিক ২৩ কিলোমিটার) পর্যন্ত জলসীমায় কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, তবে অবশ্যই ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ নির্দোষ যাতায়াতের অনুমতি দিতে হবে।

যাতায়াত তখনই ‘নির্দোষ’ হিসেবে গণ্য হবে যদি তা সংশ্লিষ্ট দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর না হয়। সামরিক পদক্ষেপ, মারাত্মক দূষণ, গোয়েন্দাগিরি এবং মাছ ধরা এক্ষেত্রে অনুমোদিত নয়। ১৯৪৯ সালে আলবেনিয়া ও গ্রিস উপকূলের করফু চ্যানেল সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একটি মামলায় এই ‘নির্দোষ যাতায়াত’ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশ্বের প্রায় ১৭০ দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাতিসংঘের এই সনদ অনুমোদন করেছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সনদে সই করলেও এখন পর্যন্ত তা অনুসমর্থন বা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি।

ফলে প্রশ্ন ওঠে—এই নিয়মগুলো কি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ, নাকি শুধু অনুমোদনকারী দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএনসিএলওএস এখন সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হিসেবে বিবেচিত। যদিও কিছু দেশ, যেমন ইরান, দাবি করে তারা ধারাবাহিকভাবে আপত্তি জানিয়ে আসায় এই নিয়ম মানতে বাধ্য নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের টোল আরোপের ক্ষমতা স্বীকার করে না।

টোলের বিরুদ্ধে কী করা যেতে পারে?

ইউএনসিএলওএস বাস্তবায়নের জন্য কোনো সরাসরি বলপ্রয়োগকারী ব্যবস্থা নেই। জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল বা নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দিতে পারেন, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের ক্ষমতা তাদের নেই।

যদিও বিকল্প কিছু উপায় রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রজোট এই সনদের নিয়ম কার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ টোলের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস করতে পারে।

এছাড়া, বিভিন্ন কোম্পানি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন শুরু করতে পারে—যা এরই মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব কোম্পানি টোল দেবে, তাদের লক্ষ্য করে আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বিভিন্ন দেশ।

সূত্র: রয়টার্স
কেএএ/

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

ইরান কি হরমুজ প্রণালিতে টোল বসাতে পারে, কী বলে আন্তর্জাতিক আইন?

আপডেট সময়ঃ ০৬:০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ করে দেয় ইরান। সম্প্রতি প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। তবে তাদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কতটা বৈধ—তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কী?

পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। এটি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। প্রণালিটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। বিশ্বে মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।

হরমুজ প্রণালির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার (১০৪ মাইল)। প্রস্থ বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন হলেও সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে জাহাজের প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য দুই মাইল করে আলাদা চ্যানেল রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দুই মাইলের একটি বাফার জোন।

আরও পড়ুন>>
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অনিশ্চিত, বন্ধই থাকছে হরমুজ প্রণালি

হরমুজে ভারতীয় ট্যাংকারে ইরানের গুলি, পিছু হটলো ২ জাহাজ
যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’ ইরান

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয় এবং যুদ্ধ শেষের শর্ত হিসেবে জাহাজ থেকে টোল আদায়ের অধিকার দাবি করে। তবে এখন পর্যন্ত বাস্তবে টোল আদায় শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কোন আইনে প্রণালি নিয়ন্ত্রিত হয়?

১৯৮২ সালে গৃহীত এবং ১৯৯৪ সাল থেকে কার্যকর জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (ইউএনসিএলওএস) অনুযায়ী, বিশ্বের ১০০টির বেশি প্রণালির মতো হরমুজ প্রণালিতেও জাহাজের ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা বাধাহীন চলাচলের অধিকার রয়েছে।

এই সনদ অনুযায়ী, কোনো প্রণালির তীরবর্তী দেশ তার ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২ দশমিক ২৩ কিলোমিটার) পর্যন্ত জলসীমায় কিছু নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে, তবে অবশ্যই ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ নির্দোষ যাতায়াতের অনুমতি দিতে হবে।

যাতায়াত তখনই ‘নির্দোষ’ হিসেবে গণ্য হবে যদি তা সংশ্লিষ্ট দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর না হয়। সামরিক পদক্ষেপ, মারাত্মক দূষণ, গোয়েন্দাগিরি এবং মাছ ধরা এক্ষেত্রে অনুমোদিত নয়। ১৯৪৯ সালে আলবেনিয়া ও গ্রিস উপকূলের করফু চ্যানেল সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একটি মামলায় এই ‘নির্দোষ যাতায়াত’ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশ্বের প্রায় ১৭০ দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাতিসংঘের এই সনদ অনুমোদন করেছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সনদে সই করলেও এখন পর্যন্ত তা অনুসমর্থন বা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি।

ফলে প্রশ্ন ওঠে—এই নিয়মগুলো কি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ, নাকি শুধু অনুমোদনকারী দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএনসিএলওএস এখন সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হিসেবে বিবেচিত। যদিও কিছু দেশ, যেমন ইরান, দাবি করে তারা ধারাবাহিকভাবে আপত্তি জানিয়ে আসায় এই নিয়ম মানতে বাধ্য নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের টোল আরোপের ক্ষমতা স্বীকার করে না।

টোলের বিরুদ্ধে কী করা যেতে পারে?

ইউএনসিএলওএস বাস্তবায়নের জন্য কোনো সরাসরি বলপ্রয়োগকারী ব্যবস্থা নেই। জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনাল বা নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দিতে পারেন, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের ক্ষমতা তাদের নেই।

যদিও বিকল্প কিছু উপায় রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রজোট এই সনদের নিয়ম কার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ টোলের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস করতে পারে।

এছাড়া, বিভিন্ন কোম্পানি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন শুরু করতে পারে—যা এরই মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব কোম্পানি টোল দেবে, তাদের লক্ষ্য করে আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বিভিন্ন দেশ।

সূত্র: রয়টার্স
কেএএ/