করোনার সময় ব্ল্যাক ফাঙ্গাস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই আতঙ্ক পুরোপুরি কাটার আগেই আবারও আলোচনায় এসেছে আরেক বিপজ্জনক ছত্রাক-অ্যাসপারজিলাস। সাধারণ ছত্রাক ভেবে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ছত্রাককে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির তালিকায় রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে এই ছত্রাক শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস, কিডনি, এমনকি হৃদ্যন্ত্রের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময়, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং দূষণের কারণে এই সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ে। তাই এখন থেকেই সতর্ক থাকা জরুরি।
অ্যাসপারজিলাস কী?
অ্যাসপারজিলাস আসলে এক ধরনের ছত্রাক, যা আমাদের চারপাশের পরিবেশেই ছড়িয়ে থাকে। মাটি, ধুলাবালি, পুরনো আবর্জনা, স্যাঁতসেঁতে জায়গা কিংবা পচা খাবারে এই ছত্রাক জন্মাতে পারে। সাধারণত সুস্থ মানুষের শরীর এই ছত্রাকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হলেও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
এই ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে যে রোগ হয় তাকে বলা হয় অ্যাসপারজিলোসিস। এটি মূলত ফুসফুসে আক্রমণ করে এবং ধীরে ধীরে শ্বাসযন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়।
কীভাবে ছড়ায় এই সংক্রমণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাসপারজিলাসের ক্ষুদ্র রেণু বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। ধুলোবালি বেশি এমন জায়গা, নির্মাণকাজ চলা এলাকা, দূষিত পরিবেশ কিংবা আর্দ্র ও বদ্ধ ঘরে এই ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
অনেক সময় এসি বা এয়ার কন্ডিশনারের অপরিষ্কার ফিল্টার থেকেও এই ছত্রাক ছড়াতে পারে। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করা এসির ভেতরে ছত্রাক জন্মে এবং সেখান থেকে বাতাসের সঙ্গে রেণু শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে ঢুকে যেতে পারে। পচা খাবার, আবর্জনা বা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল থেকেও এই ছত্রাকের বিস্তার ঘটে। তাই পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কী ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
অ্যাসপারজিলোসিসের উপসর্গ অনেকটা হাঁপানি, যক্ষ্মা বা শ্বাসকষ্টজনিত রোগের মতো হতে পারে। ফলে অনেক সময় শুরুতে রোগটি ধরা কঠিন হয়ে যায়।
এই সংক্রমণে সাধারণত দেখা দিতে পারে-
- দীর্ঘদিন কাশি থাকা
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- বুকব্যথা
- জ্বর
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- কফের সঙ্গে রক্ত আসা
- গলা ব্যথা বা সর্দি
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব দুর্বল হলে সংক্রমণ শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন কিডনি, হার্ট কিংবা মস্তিষ্কেও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
সব মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সমান নয়। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই ফুসফুসের রোগ রয়েছে, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। হাঁপানি, সিওপিডি, যক্ষ্মা বা দীর্ঘদিন ধূমপানের অভ্যাস থাকলে এই সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়া যারা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খান, ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদেরও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।
যেভাবে সতর্ক থাকবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সাধারণ অভ্যাস মেনে চললেই এই সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ধুলাবালি বেশি এমন জায়গায় গেলে মাস্ক ব্যবহার করা ভালো। নির্মাণকাজ চলছে এমন এলাকা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। ঘরের এসি নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি, বিশেষ করে ফিল্টার পরিষ্কার না থাকলে তা বিপদের কারণ হতে পারে।
আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ছত্রাক দ্রুত জন্মায়। তাই ঘর শুকনো ও পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। ঘামে ভেজা পোশাক দীর্ঘক্ষণ পরে থাকা উচিত নয়। নিয়মিত স্নান করা এবং হাত পরিষ্কার রাখাও জরুরি।
সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
অ্যাসপারজিলাস ছত্রাকের সংক্রমণ এখন আর অবহেলার বিষয় নয়। সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে দীর্ঘদিন উপসর্গ ফেলে রাখলে তা গুরুতর আকার নিতে পারে। বিশেষ করে যাদের শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
পরিচ্ছন্নতা, সঠিক জীবনযাপন এবং সামান্য সচেতনতাই এই সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, এনডিটিভি
এসএকেওয়াই
এডমিন 














