০১:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গবেষণায় রাজশাহীর ফলচাষে নীরব বিপ্লব

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
  • 2
  • বারী আম-১৪ জাত উদ্ভাবন
  • বারি ফলসা-১ জাত উদ্ভাবন
  • জনবল সংকটে গবেষণা ব্যাহত

রাজশাহীর বিনোদপুরে বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে অবস্থিত ফল গবেষণাগারে চলছে নীরব বিপ্লব। আম, লিচু কিংবা বরইয়ের জন্য পরিচিত এই ফল গবেষণা কেন্দ্র শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের ফল খাতকে সমৃদ্ধ ও আধুনিক করে তোলার জন্য কেন্দ্রটি কাজ করে যাচ্ছে।

এ গবেষণাগার ও পরীক্ষামূলক বাগানে প্রতিনিয়ত চলছে নতুন সম্ভাবনার অনুসন্ধান। কখনো রপ্তানিযোগ্য আমের জাত উদ্ভাবন, কখনো রোগবালাই প্রতিরোধী ফলের জাত উদ্ভাবন, আবার কখনো বিদেশি ফলকে দেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষকের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে পরিচালিত এই কেন্দ্রটি দেশের ছয়টি ফসল গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

আরও পড়ুন

বরিশালে ফল উৎপাদনে তরমুজের একক আধিপত্য

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয়, সেগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করা, উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন, ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানই এ কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য।

গবেষণার ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে আম, ফলসা, জামরুল, লিচু, বাতাবিলেবু এবং বারি কুলের বিভিন্ন উন্নত জাত উদ্ভাবন করে কেন্দ্রটি দেশের ফল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

জানা যায়, রাজশাহী অঞ্চলের আম ও লিচুর পাশাপাশি বর্তমানে আঙুর, বেদানা, আতা, ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরিসহ নানা দেশি-বিদেশি ফল নিয়ে এখানে নিয়মিত গবেষণা চলছে।

আরও পড়ুন

১১ ফলের জাত আবিষ্কার / নিরিবিলি পরিবেশে ৪৪ বছর ধরে কাজ করে চলেছে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা জার্মপ্লাজম এবং দেশীয় ফলের বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করা হচ্ছে নতুন নতুন সংকর ও উন্নত জাত। একইসঙ্গে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, ফলন বৃদ্ধি, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের মাঠ পর্যায়ের সমস্যার সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কেন্দ্রটি।

গবেষণায় রাজশাহীর ফলচাষে নীরব বিপ্লব

ফলে রাজশাহীর এই গবেষণা কেন্দ্র আজ শুধু একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয় বরং দেশের ফলভিত্তিক কৃষি উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তাও দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় রাজশাহীর এই ফল গবেষণা কেন্দ্র দেশের ফল গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এখানকার গবেষকরা ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা, ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং বাজার উপযোগী নতুন জাত তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করছেন।

আরও পড়ুন

যেভাবে এলো বেদানা লিচু

ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত কয়েক বছরে এই কেন্দ্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন ফলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বারি লিচু-১, বারি শাহী পেঁপে-১, বারি কুল-১, ২ ও ৩, বারি জামরুল-১, বারি বাতাবি লেবু-৩, বারি ফলসা-১ এবং বারি আম-১৪।

সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত বারি ফলসা-১ এবং বারি আম-১৪ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বারি আম-১৪ একটি আকর্ষণীয় রঙিন জাতের আম, যা বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বারি জামরুল-৩ জাতটি প্রচলিত জামরুলের তুলনায় অধিক মিষ্টি, নরম ও সুস্বাদু হওয়ায় এরই মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জানান, শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন নয়, দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে বিভিন্ন ফলগাছ সংগ্রহ করে সেগুলো নিয়ে সংকরায়ণ ও উন্নয়নমূলক গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা ফলগাছের জাতগুলো বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। সফলতা মিললে সেসব জাত কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বর্তমানে কেন্দ্রটিতে দেশি-বিদেশি অসংখ্য ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত রয়েছে, যা ভবিষ্যতের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাজশাহী অঞ্চলে লিচু একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফল। তাই লিচুর উন্নত জাত নির্বাচন ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বারি লিচু-১ থেকে বারি লিচু-৫ এবং জনপ্রিয় বোম্বাই লিচুর বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হচ্ছে কোন জাতটি রাজশাহীর আবহাওয়া ও মাটিতে সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়।

একইসঙ্গে লিচু গাছের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ছাঁটাই পদ্ধতি এবং ফলন বৃদ্ধির প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছ বেশি বড় হয়ে গেলে ফলন কমে যায়। তখন বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে গাছকে পুনরায় উৎপাদনক্ষম অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কাজও করা হয়।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিদওয়ানুল কারিম বলেন, লিচুর বাম্পার ফলনের পেছনে রয়েছে সঠিক প্রুনিংয়ের/ছাঁটাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কৃষকরা প্রুনিং সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। প্রতি বছর লিচু সংগ্রহের পর গাছের ডালপালা কেটে দিতে হয়। তাহলে লিচুর ফলন এবং আকার ঠিক থাকে।

আম গবেষণার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি আম-১ থেকে বারি আম-১৮ পর্যন্ত মোট ১৮টি আমের জাত এখানে সংরক্ষণ ও গবেষণার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে বারি আম-৩ (আম্রপালি), বারি আম-৪ (হাইব্রিড) এবং বারি আম-১৪ (রঙ্গিন জাতের আম) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা জার্মপ্লাজমের মধ্যে রয়েছে সূর্যপুরি, কিং চাকাপাত, চিয়াংমাই, কিউজাই, মিয়াজাকি,দুধসর এবং মল্লিকার মতো সম্ভাবনাময় জাত। একই সঙ্গে ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন ও হাড়িভাঙ্গার মতো জনপ্রিয় প্রচলিত জাত নিয়েও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব জাতের ফলন, স্বাদ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সংরক্ষণযোগ্যতা নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

আমের গবেষণা নিয়ে ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিদওয়ানুল কারিম বলেন, ফল গবেষণা কেন্দ্র, রাজশাহীতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত ১৮ জাতের আমসহ জার্মপ্লাজমে দেশি-বিদেশি অন্যান্য জাত রয়েছে যা আমরা হাইব্রিডাইজেশনের ক্ষেত্রে প্যারেন্ট ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ করি। এছাড়াও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের বিনামূল্যে বিভিন্ন ভালো ফলের চারা বিতরণ করা হয় যাতে কৃষকরা এসব ফল চাষে উৎসাহিত হয়।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রটিতে আঙুরের বেশ কয়েকটি জাত সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে মাঠে চাষ করা হচ্ছে। সফল ফলাফল পাওয়া গেলে উন্নত জাতগুলো কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। একইভাবে বেদানা বা ডালিমের একাধিক জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। কাস্টার্ড অ্যাপেল বা শরিফারও বেশ কয়েকটি জাত সংগ্রহ রয়েছে, যেগুলোর মধ্য থেকে উন্নত জাত নির্বাচন করে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন্দ্রটিতে শুধু আম বা লিচু নয় বর্তমানে বিভিন্ন জাতের জামরুল, পেয়ারা, বাতাবিলেবু, আঙ্গুর, কুল বা বরই, নারিকেল, কাঁঠাল, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, বেদানা, ফলসা, আমড়া, জলপাই, মাল্টা, জাম, কলা এবং পেঁপে নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি ফলের ক্ষেত্রে জাত উন্নয়ন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ফলন বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে কাজ চলছে।

গবেষণা কেন্দ্রটি কৃষকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ফলের গাছে রোগবালাই, পোকামাকড় কিংবা উৎপাদনজনিত সমস্যা নিয়ে এখানে আসেন। কেন্দ্রের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদরা রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।

কেন্দ্রটিতে আধুনিক গবেষণা প্রযুক্তির ব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে। ফলের রোগ শনাক্তকরণ, নতুন জাত নির্বাচন, সংকরায়ণ, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং ফলনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব গবেষণার ফলে কৃষকরা কম খরচে অধিক উৎপাদনের সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে সফলতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে ফল গবেষণা কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কেন্দ্রটির সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল সংকট। পর্যাপ্ত গবেষক ও প্রযুক্তিগত কর্মী না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় বাজেট ও বরাদ্দ থাকলেও জনবল স্বল্পতার কারণে সেই বরাদ্দের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গবেষণার গুণগত মান আরও উন্নত করতে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য দক্ষ জনবল বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্র দেশের ফল খাতে আধুনিকায়ন ও বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ ফলনশীল, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং বাজার উপযোগী নতুন ফলের জাত উদ্ভাবন করা, যাতে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায় এবং দেশের ফল উৎপাদন আরও সমৃদ্ধ হয়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আম, লিচু, পেয়ারা, কুল, জামরুল, বেদানা, ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি এবং আঙুরসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফল নিয়ে গবেষণা করছি। এরইমধ্যে বারি আম-১৪, বারি ফলসা-১, বারি শাহী পেঁপে-১, বারি লিচু ও বারি কুলের উন্নত জাতসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা কৃষিক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে বারি আম-১৪ রপ্তানিযোগ্য জাত হিসেবে সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং নতুন সংকর ও বিদেশি ফলের অভিযোজন নিয়েও কাজ করছি।

এফএ/জেআইএম

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

গবেষণায় রাজশাহীর ফলচাষে নীরব বিপ্লব

আপডেট সময়ঃ ০৬:০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
  • বারী আম-১৪ জাত উদ্ভাবন
  • বারি ফলসা-১ জাত উদ্ভাবন
  • জনবল সংকটে গবেষণা ব্যাহত

রাজশাহীর বিনোদপুরে বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে অবস্থিত ফল গবেষণাগারে চলছে নীরব বিপ্লব। আম, লিচু কিংবা বরইয়ের জন্য পরিচিত এই ফল গবেষণা কেন্দ্র শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের ফল খাতকে সমৃদ্ধ ও আধুনিক করে তোলার জন্য কেন্দ্রটি কাজ করে যাচ্ছে।

এ গবেষণাগার ও পরীক্ষামূলক বাগানে প্রতিনিয়ত চলছে নতুন সম্ভাবনার অনুসন্ধান। কখনো রপ্তানিযোগ্য আমের জাত উদ্ভাবন, কখনো রোগবালাই প্রতিরোধী ফলের জাত উদ্ভাবন, আবার কখনো বিদেশি ফলকে দেশের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষকের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে পরিচালিত এই কেন্দ্রটি দেশের ছয়টি ফসল গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

আরও পড়ুন

বরিশালে ফল উৎপাদনে তরমুজের একক আধিপত্য

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয়, সেগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করা, উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন, ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানই এ কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য।

গবেষণার ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে আম, ফলসা, জামরুল, লিচু, বাতাবিলেবু এবং বারি কুলের বিভিন্ন উন্নত জাত উদ্ভাবন করে কেন্দ্রটি দেশের ফল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

জানা যায়, রাজশাহী অঞ্চলের আম ও লিচুর পাশাপাশি বর্তমানে আঙুর, বেদানা, আতা, ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরিসহ নানা দেশি-বিদেশি ফল নিয়ে এখানে নিয়মিত গবেষণা চলছে।

আরও পড়ুন

১১ ফলের জাত আবিষ্কার / নিরিবিলি পরিবেশে ৪৪ বছর ধরে কাজ করে চলেছে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা জার্মপ্লাজম এবং দেশীয় ফলের বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করা হচ্ছে নতুন নতুন সংকর ও উন্নত জাত। একইসঙ্গে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, ফলন বৃদ্ধি, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের মাঠ পর্যায়ের সমস্যার সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কেন্দ্রটি।

গবেষণায় রাজশাহীর ফলচাষে নীরব বিপ্লব

ফলে রাজশাহীর এই গবেষণা কেন্দ্র আজ শুধু একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নয় বরং দেশের ফলভিত্তিক কৃষি উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তাও দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় রাজশাহীর এই ফল গবেষণা কেন্দ্র দেশের ফল গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এখানকার গবেষকরা ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা, ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং বাজার উপযোগী নতুন জাত তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করছেন।

আরও পড়ুন

যেভাবে এলো বেদানা লিচু

ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য মতে, গত কয়েক বছরে এই কেন্দ্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নতুন ফলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বারি লিচু-১, বারি শাহী পেঁপে-১, বারি কুল-১, ২ ও ৩, বারি জামরুল-১, বারি বাতাবি লেবু-৩, বারি ফলসা-১ এবং বারি আম-১৪।

সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত বারি ফলসা-১ এবং বারি আম-১৪ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বারি আম-১৪ একটি আকর্ষণীয় রঙিন জাতের আম, যা বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বারি জামরুল-৩ জাতটি প্রচলিত জামরুলের তুলনায় অধিক মিষ্টি, নরম ও সুস্বাদু হওয়ায় এরই মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জানান, শুধু নতুন জাত উদ্ভাবন নয়, দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে বিভিন্ন ফলগাছ সংগ্রহ করে সেগুলো নিয়ে সংকরায়ণ ও উন্নয়নমূলক গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা ফলগাছের জাতগুলো বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। সফলতা মিললে সেসব জাত কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বর্তমানে কেন্দ্রটিতে দেশি-বিদেশি অসংখ্য ফলের জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত রয়েছে, যা ভবিষ্যতের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাজশাহী অঞ্চলে লিচু একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফল। তাই লিচুর উন্নত জাত নির্বাচন ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে বারি লিচু-১ থেকে বারি লিচু-৫ এবং জনপ্রিয় বোম্বাই লিচুর বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হচ্ছে কোন জাতটি রাজশাহীর আবহাওয়া ও মাটিতে সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়।

একইসঙ্গে লিচু গাছের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ছাঁটাই পদ্ধতি এবং ফলন বৃদ্ধির প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছ বেশি বড় হয়ে গেলে ফলন কমে যায়। তখন বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে গাছকে পুনরায় উৎপাদনক্ষম অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কাজও করা হয়।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিদওয়ানুল কারিম বলেন, লিচুর বাম্পার ফলনের পেছনে রয়েছে সঠিক প্রুনিংয়ের/ছাঁটাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কৃষকরা প্রুনিং সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। প্রতি বছর লিচু সংগ্রহের পর গাছের ডালপালা কেটে দিতে হয়। তাহলে লিচুর ফলন এবং আকার ঠিক থাকে।

আম গবেষণার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি আম-১ থেকে বারি আম-১৮ পর্যন্ত মোট ১৮টি আমের জাত এখানে সংরক্ষণ ও গবেষণার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে বারি আম-৩ (আম্রপালি), বারি আম-৪ (হাইব্রিড) এবং বারি আম-১৪ (রঙ্গিন জাতের আম) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা জার্মপ্লাজমের মধ্যে রয়েছে সূর্যপুরি, কিং চাকাপাত, চিয়াংমাই, কিউজাই, মিয়াজাকি,দুধসর এবং মল্লিকার মতো সম্ভাবনাময় জাত। একই সঙ্গে ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন ও হাড়িভাঙ্গার মতো জনপ্রিয় প্রচলিত জাত নিয়েও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব জাতের ফলন, স্বাদ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সংরক্ষণযোগ্যতা নিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

আমের গবেষণা নিয়ে ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিদওয়ানুল কারিম বলেন, ফল গবেষণা কেন্দ্র, রাজশাহীতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত ১৮ জাতের আমসহ জার্মপ্লাজমে দেশি-বিদেশি অন্যান্য জাত রয়েছে যা আমরা হাইব্রিডাইজেশনের ক্ষেত্রে প্যারেন্ট ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ করি। এছাড়াও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের বিনামূল্যে বিভিন্ন ভালো ফলের চারা বিতরণ করা হয় যাতে কৃষকরা এসব ফল চাষে উৎসাহিত হয়।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রটিতে আঙুরের বেশ কয়েকটি জাত সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে মাঠে চাষ করা হচ্ছে। সফল ফলাফল পাওয়া গেলে উন্নত জাতগুলো কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। একইভাবে বেদানা বা ডালিমের একাধিক জাত নিয়ে গবেষণা চলছে। কাস্টার্ড অ্যাপেল বা শরিফারও বেশ কয়েকটি জাত সংগ্রহ রয়েছে, যেগুলোর মধ্য থেকে উন্নত জাত নির্বাচন করে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন্দ্রটিতে শুধু আম বা লিচু নয় বর্তমানে বিভিন্ন জাতের জামরুল, পেয়ারা, বাতাবিলেবু, আঙ্গুর, কুল বা বরই, নারিকেল, কাঁঠাল, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, বেদানা, ফলসা, আমড়া, জলপাই, মাল্টা, জাম, কলা এবং পেঁপে নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি ফলের ক্ষেত্রে জাত উন্নয়ন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ফলন বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে কাজ চলছে।

গবেষণা কেন্দ্রটি কৃষকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ফলের গাছে রোগবালাই, পোকামাকড় কিংবা উৎপাদনজনিত সমস্যা নিয়ে এখানে আসেন। কেন্দ্রের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদরা রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।

কেন্দ্রটিতে আধুনিক গবেষণা প্রযুক্তির ব্যবহারও ক্রমেই বাড়ছে। ফলের রোগ শনাক্তকরণ, নতুন জাত নির্বাচন, সংকরায়ণ, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং ফলনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব গবেষণার ফলে কৃষকরা কম খরচে অধিক উৎপাদনের সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে সফলতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে ফল গবেষণা কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কেন্দ্রটির সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল সংকট। পর্যাপ্ত গবেষক ও প্রযুক্তিগত কর্মী না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার পরিধি বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় বাজেট ও বরাদ্দ থাকলেও জনবল স্বল্পতার কারণে সেই বরাদ্দের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গবেষণার গুণগত মান আরও উন্নত করতে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য দক্ষ জনবল বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্র দেশের ফল খাতে আধুনিকায়ন ও বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ ফলনশীল, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং বাজার উপযোগী নতুন ফলের জাত উদ্ভাবন করা, যাতে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায় এবং দেশের ফল উৎপাদন আরও সমৃদ্ধ হয়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আম, লিচু, পেয়ারা, কুল, জামরুল, বেদানা, ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি এবং আঙুরসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফল নিয়ে গবেষণা করছি। এরইমধ্যে বারি আম-১৪, বারি ফলসা-১, বারি শাহী পেঁপে-১, বারি লিচু ও বারি কুলের উন্নত জাতসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা কৃষিক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে বারি আম-১৪ রপ্তানিযোগ্য জাত হিসেবে সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং নতুন সংকর ও বিদেশি ফলের অভিযোজন নিয়েও কাজ করছি।

এফএ/জেআইএম