বিশ্ব আজ এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। পুরোনো জোটের ভিত্তি নড়বড়ে, নতুন শক্তির উত্থানে বদলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং বেইজিংকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই পরিবর্তন শুধু ভূরাজনীতির মানচিত্রই পুনর্লিখন করছে না, বরং ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যৎও নতুন করে নির্ধারণ করছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই, কীভাবে রক্ষা পাবে তার সার্বভৌম মর্যাদা ও কৌশলগত স্বাধীনতা?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ন্যাটো ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, উন্নত গোয়েন্দা প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সহায়তা এই জোটকে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর রেখেছে। ফলে ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ন্যাটোর ভূমিকা অপরিসীম।
তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত মনোযোগ ক্রমশ এশিয়ার দিকে সরিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে চীনের উত্থান বিশ্বরাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে ইউরোপে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি ইউরোপ নিরাপদ থাকতে পারবে?
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা বাস্তবতাকে নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে। এই সংঘাত দেখিয়েছে যে সামরিক আগ্রাসন এখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন সত্য। এর ফলে ন্যাটোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে এবং ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা স্পষ্ট হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রচেষ্টা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য ন্যাটোকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী করা। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও ইউরোপ এখনও সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ নয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন স্বার্থ এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে জার্মানি প্রতিরক্ষা খাতে নতুন বিনিয়োগ করছে। তাদের নীতিগত পরিবর্তন ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবুও জার্মানি এককভাবে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম নয়; এটি একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র রক্ষাকবচ নয়।
চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উত্থান বিশ্বকে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হলেও মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্যের কারণে সামরিক বা কৌশলগত নির্ভরতা বাস্তবসম্মত নয়। বেইজিং আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
এই বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস কেবল ইউরোপ বা আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব সরাসরি এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ আজ আর কেবল একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তি। ভারত ও চীনের মাঝে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী এবং একটি অনিবার্য ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এই সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে বাংলাদেশের জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক বিদ্যমান, ভারত তার আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে বলে অনেকের ধারণা। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কৌশলগত নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়।
এমনকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভারতের প্রভাব এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনাও জনমনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, জনগণের একাংশের মধ্যে এ নিয়ে সন্দেহ ও অসন্তোষের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে এসব প্রশ্ন স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।
তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং সীমান্ত ইস্যু সম্পর্ককে অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে স্পষ্ট হয়েছে যে ভারতকে এড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু একতরফা প্রভাব মেনে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। সম্পর্ক হতে হবে সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌম স্বার্থের ভিত্তিতে। একটি স্থিতিশীল ও টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
চীন আজকের বিশ্বে এক অনস্বীকার্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি। উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেশটির অগ্রযাত্রা বিশ্বকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য চীন শুধু একটি বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বরং উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী। বেইজিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতা দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার এবং বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও শিল্প প্রকল্প দেশের উন্নয়নকে নতুন গতি দিয়েছে। এসব উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই বাড়ায়নি, বরং আঞ্চলিক সংযোগ ও শিল্পায়নের ভিত্তিও শক্তিশালী করেছে। ফলে চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় এক নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বর্তমান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে ইউরোপীয় দেশগুলোও ক্রমশ চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে নিজের জাতীয় স্বার্থে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা সেই কৌশলগত স্বাধীনতারই প্রতিফলন।
চীনের উন্নয়ন মডেল, দূরদর্শিতা, পরিশ্রম এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগের সমন্বয়, বাংলাদেশের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে চীনের সাফল্য উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
তবে যে কোনো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো এখানেও প্রয়োজন বিচক্ষণতা ও ভারসাম্য। সহযোগিতা হতে হবে স্বচ্ছ, টেকসই এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর। অতিরিক্ত নির্ভরতা নয়, বরং পারস্পরিক সুবিধা ও সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে উঠা অংশীদারত্বই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পথ।
সুতরাং বলা যায়, চীন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি অর্থনৈতিক সহযোগী নয়; এটি উন্নয়ন, সংযোগ এবং কৌশলগত সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ দিগন্ত। একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও দূরদর্শী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এই সুযোগকে প্রজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজে লাগানো।
তবে এই সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও কৌশলগত নির্ভরতা এড়ানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে উন্নয়ন অংশীদারত্ব জাতীয় স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
চীনের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেমন উন্নয়নকেন্দ্রিক, তেমনি একইভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও জ্বালানি কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সম্পর্ক মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংযোগ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কারণ এই দেশগুলোতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ এই অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল।
এই সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয় পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং শ্রম ও জ্বালানি নীতির মাধ্যমে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে।
এছাড়া ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামে অংশগ্রহণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক নীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামাও এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী কল্যাণ এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে একটি বহুমাত্রিক নির্ভরশীল কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেছে, যেখানে কোনো একক অঞ্চল নয় বরং একাধিক শক্তি কেন্দ্র একসঙ্গে প্রভাব বিস্তার করে।
এই জটিল ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি সুসংহত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি স্বাধীন, বাস্তববাদী এবং বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির ওপর। সেই নীতির ভিত্তি হতে পারে,
১. কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা
২. ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান্তরাল ও ভারসাম্যপূর্ণ সহযোগিতা
৩. যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক জোরদার করা
৪. মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রবাসী কল্যাণভিত্তিক কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুসংহত করা
৫. আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা
৬. জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া
৭. শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ এবং বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি প্রত্যাশা করে। তারা চায় সমান অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার।
বিশ্ব আজ এক জটিল ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো এখনও কার্যকর, অন্যদিকে চীনের উত্থান, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক শক্তির বিকাশ নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
এই চারটি ভিন্ন ভিন্ন শক্তি কেন্দ্র—পশ্চিমা জোট, চীন, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্য—বাংলাদেশের জন্য কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়, বরং একসাথে একটি জটিল কৌশলগত মানচিত্র তৈরি করেছে।
এই পরিবর্তনের ভেতর বাংলাদেশ একদিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতেও অবস্থান করছে। ভারত একটি অনিবার্য প্রতিবেশী বাস্তবতা হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌম স্বার্থ। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং কৌশলগত সহযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় অংশীদার, যার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর ও দূরদর্শীভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আবার মনে করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রবাসী আয়ের ওপরও গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বাস্তবতা একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, বরং বহুস্তরীয় সম্পর্কের একটি জটিল সমন্বয়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার কৌশলগত ভারসাম্য এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। বাংলাদেশকে একদিকে ভারতের সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গভীর করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা। এটাই বাংলাদেশের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ, বাস্তববাদী এবং টেকসই ভবিষ্যতের পথ। এই পথ কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়, বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
Rahman.Mridha@gmail.com
এমআরএম
এডমিন 











