০২:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা ভুলে গেল বিশ্ব?

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ১২:০৪:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • 5

গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। এমনটাই মনে করেন ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান। তার মতে, ইরানের যুদ্ধ গাজায় চলমান সংকট থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে, যা লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

গাজা পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের আগ্রহ কমে গেছে। এমনকি গাজা পরিস্থিতি ‘পুনরুদ্ধারে অবিলম্বে যা কিছু প্রয়োজন’ সেগুলোর ক্ষেত্রেও অনেক বিলম্ব ঘটছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে বিশ্ব নেতারা আসন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের ছয় মাস পরও, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই উপত্যকার প্রতি মনোযোগের অভাবের কারণে চুক্তির বিধানগুলো এমনভাবে বাস্তবায়িত হয়নি যা গাজাবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। সাহায্য সংস্থা এবং জাতিসংঘ বলছে, সেখানে ত্রাণ সহায়তা এখনো অপর্যাপ্ত এবং জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

jagonews24.comগাজায় খাবারের তীব্র সংকট/ ছবি: এএফপি

সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসরায়েলের বর্বর হত্যাকাণ্ড এখনো থেমে নেই এবং একই সঙ্গে অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনাও চলছেই।

গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি আলোচনার যে প্রচেষ্টা চলছিল, ইরান সংঘাতের কারণে তা দীর্ঘ সময় ধরে গতিহীন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কিছু কূটনৈতিক তৎপরতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সেটাও খুব একটা আশার আলো দেখাচ্ছে না। 

বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তি এবং সংবাদমাধ্যমের নজর ইরান যুদ্ধের দিকে থাকায় গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে সেখানে পরিকল্পিতভাবে ‌‘দুর্ভীক্ষনীতি’ কার্যকর করার মতো চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়েছে।

ইরান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যস্ততার সুযোগে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলা এবং প্রাণহানি অব্যাহত থাকলেও তা বিশ্ব গণমাধ্যমে আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, আঞ্চলিক এই মহাযুদ্ধের ছায়ায় অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং উচ্ছেদ অভিযান আরও জোরালো হয়েছে।

আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই জীবনযাপন
গাজায় কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধে ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়, আবর্জনার স্তূপ গাজার লাখ লাখ মানুষের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সেখানকার বেশিরভাগ মানুষই এখন অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। শীত কিংবা বর্ষায় এসব মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। সারাবিশ্ব এই দুর্ভোগ দেখেও নিশ্চুপ। ফিলিস্তিনিদের আতর্নাদ বিশ্বের মানুষের কানে পৌঁছাচ্ছে না, কারও মন গলছে না। মনে হচ্ছে যেন, ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা সবাই ভুলেই গেছে।

হোয়াইট হাউজ গত নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত তাদের শান্তি পরিকল্পনাকে ‌স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ হিসেবে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেছে।

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য একটি শান্তি বোর্ড গঠন করে, যার মধ্যে জিম্মি ও বন্দীদের মুক্তি, যুদ্ধবিরতি, গাজায় প্রবেশকারী সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।

jagonews24.comধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছেন এক অসহায় ফিলিস্তিনি নারী/ছবি: এএফপি

ইসরায়েল ও হামাস বন্দি ও জিম্মিদের মুক্তি দিতে সম্মত হলেও চুক্তির অন্যান্য বিধানগুলো আটকে গেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে জাতিসংঘ জানিয়েছে, সহিংসতার তীব্রতা কমলেও গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও শত শত ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। অপরদিকে ইসরায়েলও হামাসকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংস্থা রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, শান্তি পরিকল্পনার মূল বিধানগুলো ‌কেবল আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে অথবা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে ব্যর্থ হয়েছে। পরিকল্পনার পরবর্তী পর্যায়গুলো-যেমন হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, জাতিসংঘের অনুমোদিত একটি ফিলিস্তিনি কমিটির কাছে গাজার শাসনভার হস্তান্তর এবং পুনর্গঠন এখনো অনেক দূরে।

প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে
মিশর, কাতার এবং তুরস্কের নেতা যারা শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পের পাশাপাশি শান্তি পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছিলেন, তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো যেন বাস্তবে পরিণত হয় তা নিশ্চিত করার জন্য প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে।

ওই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সব পক্ষকেই জবাবদিহি করতে হবে। মানবিক দুর্ভোগ কমাতে সময়সীমা ‌যত দ্রুত সম্ভব কম হওয়া প্রয়োজন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সীমান্তে প্রবেশ করে আকস্মিক হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এরপরেই গাজায় পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। এরপর থেকেই কয়েক বছর ধরে সেখানে সংঘাত চলছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলের অভিযানে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। ইসরায়েলের বর্বর আগ্রাসনে উপত্যকার বেশিরভাগ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের ফলে গণহত্যা এবং সেখানকার জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখার অভিযোগ উঠেছে। যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। গাজা ছাড়াও আঞ্চলিক যুদ্ধের ছায়ায় অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

বিশ্বের মনোযোগ অন্য দিকে থাকায় গাজা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। কারণ ইসরায়েলিরা মনে করছে তারা যা খুশি তাই করতে পারে।

jagonews24.comইসরায়েলি হামলায় সন্তানহারা বাবার আর্তনাদ/ছবি: এএফপি

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক কার্যালয় গত মার্চের শেষে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

গাজা পুনরুদ্ধারে প্রায় ৭১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য আগামী ১০ বছরে ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন।

‘গাজা র‍্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্ট’ (আরডিএনএ) প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ জোর দিয়ে বলেছে যে, এই সংঘাত ‌‘মানব উন্নয়নের উপর বিপর্যয়কর প্রভাব’ ফেলেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই উপত্যকার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গাজার পুনর্গঠনের প্রথম ১৮ মাসে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা পুনরুদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং এর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার জন্য ২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে।

প্রতিবেদনটির পৃষ্ঠপোষকদের একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভৌত অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক তিন হাজার ৫২০ কোটি ডলার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ২৭০ কোটি ডলার।

গাজা যেন এক সমাধিস্থল
জাতিসংঘ বলেছে, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। এখানে সেখানে ধ্বংসস্তূপ আর মরদেহ যেন এই উপত্যকাকে এক সমাধিস্থলে পরিণত করেছে।

আরডিএনএ-এর মতে, গাজার ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি আবাসন ইউনিট ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভূখণ্ডের ৫০ শতাংশেরও বেশি হাসপাতাল অকার্যকর এবং প্রায় সব স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাজার অর্থনীতি ৮৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। এছাড়া অনেকেই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। প্রতিনিয়ত তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এখান থেকে সেখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং কৃষি এবং এই সংঘাত গাজার মানব উন্নয়নকে ৭৭ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।

জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই গাজার পুনর্গঠনকে ‌‘ফিলিস্তিনি-নেতৃত্বাধীন’ এবং ‘ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে শাসন হস্তান্তরকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে এমন পদ্ধতির’ উপর ভিত্তি করে করার আহ্বান জানিয়েছে।

jagonews24.comশিশুদের ওপরও বর্বর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল/ছবি: এএফপি

এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনার বিপরীত যেখানে তিনি বলেছিলেন যে, গাজাকে জনশূন্য করে ভূমধ্যসাগরের তীরে একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠন করা যেতে পারে।

গাজা উপত্যকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত ৮ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে এসব মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল জানিয়েছেন, বর্তমানে যে সরঞ্জাম রয়েছে তা অত্যন্ত পুরোনো এবং ইসরায়েলি বাহিনীর দুই বছরের সামরিক অভিযানে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলা তথা সরানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মৃতদেহের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রতিদিনই নতুন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম সামনে আসছে। এছাড়া উপত্যকাজুড়ে ইঁদুর ও বিভিন্ন প্রাণীর বিস্তার ঘটেছে যা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তবে ধ্বংসস্তূপ সরাতে উপযোগী ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না ইসরায়েল। 

সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, এএফপি, দ্য ন্যাশনাল নিউজডটকম

টিটিএন

ট্যাগঃ

ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা ভুলে গেল বিশ্ব?

আপডেট সময়ঃ ১২:০৪:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের মনোযোগ সরিয়ে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। এমনটাই মনে করেন ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান। তার মতে, ইরানের যুদ্ধ গাজায় চলমান সংকট থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে দিচ্ছে, যা লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

গাজা পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের আগ্রহ কমে গেছে। এমনকি গাজা পরিস্থিতি ‘পুনরুদ্ধারে অবিলম্বে যা কিছু প্রয়োজন’ সেগুলোর ক্ষেত্রেও অনেক বিলম্ব ঘটছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে বিশ্ব নেতারা আসন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের ছয় মাস পরও, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই উপত্যকার প্রতি মনোযোগের অভাবের কারণে চুক্তির বিধানগুলো এমনভাবে বাস্তবায়িত হয়নি যা গাজাবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। সাহায্য সংস্থা এবং জাতিসংঘ বলছে, সেখানে ত্রাণ সহায়তা এখনো অপর্যাপ্ত এবং জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

jagonews24.comগাজায় খাবারের তীব্র সংকট/ ছবি: এএফপি

সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসরায়েলের বর্বর হত্যাকাণ্ড এখনো থেমে নেই এবং একই সঙ্গে অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনাও চলছেই।

গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি আলোচনার যে প্রচেষ্টা চলছিল, ইরান সংঘাতের কারণে তা দীর্ঘ সময় ধরে গতিহীন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কিছু কূটনৈতিক তৎপরতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সেটাও খুব একটা আশার আলো দেখাচ্ছে না। 

বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তি এবং সংবাদমাধ্যমের নজর ইরান যুদ্ধের দিকে থাকায় গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে সেখানে পরিকল্পিতভাবে ‌‘দুর্ভীক্ষনীতি’ কার্যকর করার মতো চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়েছে।

ইরান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যস্ততার সুযোগে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান ও স্থল হামলা এবং প্রাণহানি অব্যাহত থাকলেও তা বিশ্ব গণমাধ্যমে আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, আঞ্চলিক এই মহাযুদ্ধের ছায়ায় অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং উচ্ছেদ অভিযান আরও জোরালো হয়েছে।

আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই জীবনযাপন
গাজায় কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধে ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়, আবর্জনার স্তূপ গাজার লাখ লাখ মানুষের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সেখানকার বেশিরভাগ মানুষই এখন অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। শীত কিংবা বর্ষায় এসব মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। সারাবিশ্ব এই দুর্ভোগ দেখেও নিশ্চুপ। ফিলিস্তিনিদের আতর্নাদ বিশ্বের মানুষের কানে পৌঁছাচ্ছে না, কারও মন গলছে না। মনে হচ্ছে যেন, ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা সবাই ভুলেই গেছে।

হোয়াইট হাউজ গত নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত তাদের শান্তি পরিকল্পনাকে ‌স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ হিসেবে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেছে।

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য একটি শান্তি বোর্ড গঠন করে, যার মধ্যে জিম্মি ও বন্দীদের মুক্তি, যুদ্ধবিরতি, গাজায় প্রবেশকারী সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।

jagonews24.comধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে আছেন এক অসহায় ফিলিস্তিনি নারী/ছবি: এএফপি

ইসরায়েল ও হামাস বন্দি ও জিম্মিদের মুক্তি দিতে সম্মত হলেও চুক্তির অন্যান্য বিধানগুলো আটকে গেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে জাতিসংঘ জানিয়েছে, সহিংসতার তীব্রতা কমলেও গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও শত শত ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। অপরদিকে ইসরায়েলও হামাসকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংস্থা রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, শান্তি পরিকল্পনার মূল বিধানগুলো ‌কেবল আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে অথবা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে ব্যর্থ হয়েছে। পরিকল্পনার পরবর্তী পর্যায়গুলো-যেমন হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, জাতিসংঘের অনুমোদিত একটি ফিলিস্তিনি কমিটির কাছে গাজার শাসনভার হস্তান্তর এবং পুনর্গঠন এখনো অনেক দূরে।

প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে
মিশর, কাতার এবং তুরস্কের নেতা যারা শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং ট্রাম্পের পাশাপাশি শান্তি পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছিলেন, তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো যেন বাস্তবে পরিণত হয় তা নিশ্চিত করার জন্য প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে।

ওই চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সব পক্ষকেই জবাবদিহি করতে হবে। মানবিক দুর্ভোগ কমাতে সময়সীমা ‌যত দ্রুত সম্ভব কম হওয়া প্রয়োজন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের সীমান্তে প্রবেশ করে আকস্মিক হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এরপরেই গাজায় পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। এরপর থেকেই কয়েক বছর ধরে সেখানে সংঘাত চলছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলের অভিযানে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। ইসরায়েলের বর্বর আগ্রাসনে উপত্যকার বেশিরভাগ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের ফলে গণহত্যা এবং সেখানকার জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখার অভিযোগ উঠেছে। যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। গাজা ছাড়াও আঞ্চলিক যুদ্ধের ছায়ায় অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

বিশ্বের মনোযোগ অন্য দিকে থাকায় গাজা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। কারণ ইসরায়েলিরা মনে করছে তারা যা খুশি তাই করতে পারে।

jagonews24.comইসরায়েলি হামলায় সন্তানহারা বাবার আর্তনাদ/ছবি: এএফপি

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক কার্যালয় গত মার্চের শেষে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনে পৌঁছেছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

গাজা পুনরুদ্ধারে প্রায় ৭১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য আগামী ১০ বছরে ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন।

‘গাজা র‍্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্ট’ (আরডিএনএ) প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ জোর দিয়ে বলেছে যে, এই সংঘাত ‌‘মানব উন্নয়নের উপর বিপর্যয়কর প্রভাব’ ফেলেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই উপত্যকার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গাজার পুনর্গঠনের প্রথম ১৮ মাসে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা পুনরুদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং এর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার জন্য ২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে।

প্রতিবেদনটির পৃষ্ঠপোষকদের একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভৌত অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক তিন হাজার ৫২০ কোটি ডলার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ২৭০ কোটি ডলার।

গাজা যেন এক সমাধিস্থল
জাতিসংঘ বলেছে, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত গাজায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। এখানে সেখানে ধ্বংসস্তূপ আর মরদেহ যেন এই উপত্যকাকে এক সমাধিস্থলে পরিণত করেছে।

আরডিএনএ-এর মতে, গাজার ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি আবাসন ইউনিট ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভূখণ্ডের ৫০ শতাংশেরও বেশি হাসপাতাল অকার্যকর এবং প্রায় সব স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাজার অর্থনীতি ৮৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। এছাড়া অনেকেই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। প্রতিনিয়ত তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এখান থেকে সেখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভূখণ্ডের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং কৃষি এবং এই সংঘাত গাজার মানব উন্নয়নকে ৭৭ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।

জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই গাজার পুনর্গঠনকে ‌‘ফিলিস্তিনি-নেতৃত্বাধীন’ এবং ‘ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে শাসন হস্তান্তরকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে এমন পদ্ধতির’ উপর ভিত্তি করে করার আহ্বান জানিয়েছে।

jagonews24.comশিশুদের ওপরও বর্বর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল/ছবি: এএফপি

এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনার বিপরীত যেখানে তিনি বলেছিলেন যে, গাজাকে জনশূন্য করে ভূমধ্যসাগরের তীরে একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠন করা যেতে পারে।

গাজা উপত্যকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অন্তত ৮ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে এসব মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল জানিয়েছেন, বর্তমানে যে সরঞ্জাম রয়েছে তা অত্যন্ত পুরোনো এবং ইসরায়েলি বাহিনীর দুই বছরের সামরিক অভিযানে সৃষ্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলা তথা সরানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মৃতদেহের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রতিদিনই নতুন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম সামনে আসছে। এছাড়া উপত্যকাজুড়ে ইঁদুর ও বিভিন্ন প্রাণীর বিস্তার ঘটেছে যা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তবে ধ্বংসস্তূপ সরাতে উপযোগী ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না ইসরায়েল। 

সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, এএফপি, দ্য ন্যাশনাল নিউজডটকম

টিটিএন