বিশ্বকাপ আসলে কাদের? এটা কি শুধুই বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণী আসর? ৪ বছর পর পর এই আসরের চ্যাম্পিয়ন দল বনে যায় ফুটবলের রাজাধিরাজ। সেই দলের নামে তকমা আঁটা হয় বিশ্বসেরার। সেটাই কি সব? বিশ্বকাপ ফুটবলের কি আর মাহাত্ম্য নেই? আর বিশেষ কোনো তাৎপর্য কি নেই?
তা নিয়ে আছে নানা মত। এক পক্ষের মত, বিশ্বকাপ ফুটবল শুধুই নামি-দামি তারকাদের মহানায়ক হওয়ার ক্ষেত্র। আবার অন্য পক্ষের মত, ওয়ার্ল্ডকাপ ফুটবল আসলে প্রতিষ্ঠিত ফুটবলারদের গায়ে ‘বিশ্ব তারকা’ লেভেল আঁটার মঞ্চ। আবার কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন, বিশ্বকাপ হলো নায়ক বেশে এসে খলনায়ক বনে যাওয়ার রঙ্গমঞ্চ!
এখন প্রশ্ন হলো, সেটাই কি বিশ্বকাপের শেষ উপমা, বা সব পরিচয়? নাহ, তা নয় মোটেই। আসলে বিশ্বকাপ অনেক নতুন তারার আবির্ভাবেরও প্ল্যাটফর্ম।
বিশ্বকাপ মানেই যে নামি, দামি ও প্রতিষ্ঠিত তারকাদের মাঠ মাতানো, সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের মঞ্চ, তা নয়। বিশ্বকাপ অনেক আনকোরা নবীন প্রতিভার স্ফুরণেরও শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র।
ইতিহাস জানাচ্ছে, বিশ্বকাপ শুধুই প্রতিষ্ঠিত তারকার ‘বিশ্ব তারকা’ হয়ে ওঠার ক্ষেত্র নয়। বিশ্বকাপ অনেক তরুণ ও আনকোরা প্রতিভার অভ্যুদয় ঘটারও শ্রেষ্ঠতম ক্ষেত্র। তার প্রথম উদাহরণ অ্যাডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো পেলে।
ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে
১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ফুটবল বিশ্ব দেখা পায় ‘কালো মানিক’ পেলের। ১৭ বছর ২৪৯ দিনের কিশোর পেলের সে সময়ের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে সুইডেনের মাটিতে হওয়া সেই ওয়ার্ল্ডকাপে।
অতটুকু বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই পেলে আলোড়ন তোলেন। তার জাদুকরি ফুটবল নৈপুণ্যে ও গোল করার দক্ষতায় চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় বড় বড় ফুটবল বোদ্ধাদের।
সবাইকে অবাক করে পেলে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই করে বসেন ৬ গোল। এর মধ্যে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও করে বসেন ফুটবলের নতুন প্রতিভা।
আর ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনকে ৫-২ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল যে প্রথমবার বিশ্ববিজয়ী হয়, সে ম্যাচের জয়ের রূপকার ও নায়কও পেলে। ১৭ বছরের কিশোর পেলেই করেন ২ গোল।
সেই প্রথম ফুটবল বিশ্ব দেখলো, চিনলো, জানলো; বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন তারার জন্ম হয়েছে, নাম পেলে। তারপর যে কয়টা বিশ্বকাপের আসর বসেছে, তার প্রায় বেশিরভাগ আসরেই একজন না একজন নতুন তারকার অভ্যুদয় ঘটেছে। যাকে হয়তো বিশ্বকাপের আগে সেভাবে চিনতো না ফুটবল বিশ্ব।
এর মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যারা আগে বিশ্বকাপ না খেললেও ক্লাব ফুটবলে আলো ছড়িয়ে আগেই নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছেন।
আর্জেন্টাইন মহাতারকা ম্যারাডোনা
তাদের মধ্যে সবার আগে আসবে ফুটবল সম্রাট ডিয়েগো ম্যারাডোনার নাম। তার সঙ্গে ১৯৮২ সালের ওয়ার্ল্ডকাপ পায় আরও দুইজন নতুন তারকার দেখা। যার একজন হলেন ইতালির পাওলো রোসি। তিনি জেলখানায় ছিলেন। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া রোসিকে নিজে যেচে দলে ভেড়ান তখনকার ইতালিয়ান কোচ এঞ্জো বিয়ারজোট। তার ইচ্ছেতেই রোসি প্রথম বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পান।
আর নকআউট পর্বে সেরা ১৬-এর লড়াইয়ে রোসির অনবদ্য হ্যাটট্রিকে ইতালির কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় সেবারের হট ফেভারিট ব্রাজিল।
ইতালি সেবার বিশ্বকাপ জেতে। এবং প্রথমবার ওয়ার্ল্ডকাপ খেলতে নেমেই সেরা ফুটবলারের পুরস্কার পান পাওলো রোসি।
সেই ‘আসলাম, দেখলাম, জয় করলাম’-এর মতো। বিশ্বকাপ অভিষেকেই পাওলো রোসি সবার মন জয় করেন। মাঠের সেরা পারফরমারও বনে যান।
ইতালিয়ান কিংবদন্তি পাওলো রসি
রসির হাত ধরেই ইতালি বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়। একদম কোথাও না থাকা রোসি, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায়ঘণ্টা বাজানোর পাশাপাশি ফাইনালে গোল করে ইতালিকে বিশ্বসেরার মুকুট জিতিয়ে নায়ক বনে যান।
কিন্তু ফুটবলের অসামান্য প্রতিভা ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ অভিষেক আসরটি শুভ হয়নি। আর্জেন্টিনার হয়ে ১৯৮২ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে সে অর্থে খুব ভালোভাবে শেষ করতে পারেননি ম্যারাডোনা। ব্রাজিলের সঙ্গে খেলায় লালকার্ড পেয়ে বহিষ্কৃতও হন।
এরপর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো ওয়ার্ল্ডকাপে আরও একজন অত্যন্ত উচ্চমার্গের বল প্লেয়ার ও দক্ষ স্ট্রাইকারের দেখা মেলে, নাম এমিলিও বুত্রাগেনো। মাত্র ২২ বছর বয়সে স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় তার।
বিশ্বকাপ খেলার আগে নিজ দেশের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলতে নেমেই আলোড়ন তোলেন বুত্রাগেনো। নিজের প্রতিভার জানান দেন। এবং ফুটবল বিশ্ব জেনে গিয়েছিল একজন অনেক উচ্চমার্গের ফুটবলারের বিশ্বকাপ অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে।
স্পেনের এমিলিও বুত্রাগেনো
বাস্তবে বুত্রাগেনো নিজের প্রতিভার স্ফুরণও ঘটিয়েছেন। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে এক অন্য রেকর্ড, ইতিহাস গড়েন। ডেনমার্কের বিপক্ষে সেরা ষোলোর লড়াইয়ে এক ম্যাচে ৪ গোল করে বসেন।
১৯৬৬ সালে পর্তুগাল কিংবদন্তি ইউসেবিও এক ম্যাচে ৪ গোল করে সাড়া জাগান। তারপর ৭০, ৭৪, ৭৮, ৮২—পরপর ৪ আসরে কেউ অমন কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। বুত্রাগেনো সেটাই করে দেখান।
এরপর ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েন (১৯৯৮), জার্মানির থমাস মুলার (২০১০), ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে (২০১৮), আর্জেন্টিনার এঞ্জো ফার্নান্দেজও (২০২২) প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে তারকা বনে যান। বিশ্বে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
এ তো গেল তরুণদের জয়গান। বয়স্ক ‘তারাও’ কিন্তু আছে। সেই তালিকায় সবার আগে আসবে ক্যামেরুনের দক্ষ স্ট্রাইকার রজার মিলার নাম।
যদিও তার বিশ্বকাপ অভিষেক ১৯৮২ সালে। তারপরও ১৯৯০ সালে ৩৮ বছর বয়সে রজার মিলার প্রতিভার সত্যিকার স্ফুরণ ঘটে। সেবার রজার মিলা চারটি গোল করে হৈচৈ ফেলে দেন। যার বেশির ভাগ গোলই ছিল বদলি খেলোয়াড় হিসেবে খেলতে নেমে। প্রতিপক্ষ বক্সে ওৎ পেতে থাকা মিলার বল পেলেই গোলে শট নিতে পারতেন।
দীর্ঘদিন পর এবার আরেক বর্ষীয়ান যোদ্ধার দেখা পেল ফুটবল বিশ্ব। সে অর্থে এবারের আসরের পর্দা ওঠার আগে কেউ তাকে চিনতো না। শুধু তার কথা বলা কেন? তার দলের তথা দেশ কেপ ভার্দের নাম শোনা ফুটবল অনুরাগীর সংখ্যাও বাংলাদেশে কম।
ভোজিনহার দুর্দান্ত একটি সেভ
এমনকি স্পেনের বিপক্ষে ভোজিনহা মাঠে নামার আগেও তার নাম শোনেনি অনেকেই। কিন্তু কাল সোমবার রাতের পর এই গোলরক্ষকের নাম সবার মুখে মুখে।
কেপ ভার্দের এই ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার দেখিয়ে দিলেন, প্রতিভা থাকলে দল বা দেশ কোনো ব্যাপার নয়। প্রতিভাবানদের জন্য শুধু বড় দল, ভালো দলই শেষ কথা নয়। মেধা, মনন, প্রজ্ঞা থাকলে যে কোনো দেশের যে কোনো বয়সী ফুটবলারই আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেন।
ভোজিনহা বলতে গেলে একা স্পেনের মুহুর্মুহু আক্রমণ রুখে দিয়েছেন। বেশ কিছু গোলপ্রচেষ্টা নস্যাৎ করে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দেকে একটি পয়েন্ট উপহার দিয়েছেন। তার দৃঢ়তায় অন্যতম ফেবারিট স্পেনের সঙ্গে হার এড়িয়েছে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে।
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেওয়া কেপ ভার্দে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে ০-০ গোলে রুখে দেয়। সেই ম্যাচে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলের নায়ক বনে যান ভোজিনহা। যাকে নিয়েই এখন আলোচনা ফুটবল বিশ্বে।
এআরবি/এমএমআর
এডমিন 














