প্রতিদিন সকালে চোখ মেলে তাকানো, এক গ্লাস পানি গিলে ফেলার সামর্থ্য, পাশে থাকা প্রিয়জনের মুখ—এসবই আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ, যা আমরা প্রায়ই খেয়াল করি না। একজন মুমিনের অন্যতম গুণ হলো এই নেয়ামতগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ থাকা।
আর কৃতজ্ঞতা স্রেফ একটা নৈতিক ভালো গুণ নয়, এর পেছনে দুনিয়া ও আখিরাতের বাস্তব কিছু লাভ আছে।
১. নেয়ামত বাড়ে
আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
এখানে কী বৃদ্ধি পাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। মুফাসসিরদের মতে, এর মধ্যে রিজিক, বরকত, মানসিক প্রশান্তি, ইমান—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা শুধু একটা অনুভূতি নয়, এটা নিয়ামত আকর্ষণ করার একটা মাধ্যমও।
২. মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়
কৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রতি যেমন, মানুষের প্রতিও তেমন। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৪)
যিনি মানুষের উপকারের স্বীকৃতি দিতে জানেন, তিনি সহজেই তাদের ভালোবাসা অর্জন করেন, আর এই অভ্যাসই আসলে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার একটা সম্প্রসারণ।
৩. কঠিন সময়েও মনের জোর থাকে
জীবনে সুখ-দুঃখ দুটোই আল্লাহর পরীক্ষা। যার কৃতজ্ঞতার অভ্যাস আছে, বিপদের মুহূর্তেও তিনি আল্লাহর অন্য নেয়ামতগুলো স্মরণ করতে পারেন, আর তাতে ধৈর্য ধরা সহজ হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা বড়ই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর কষ্টে আক্রান্ত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে তা–ও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা আর ধৈর্য মিলে মুমিনের জীবনের প্রতিটা মোড়কেই একটা লাভের জায়গায় নিয়ে যায়।
৪. মনে প্রশান্তি আসে
আজকের দিনের মানসিক অস্থিরতার একটা বড় কারণ হলো নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা। এ তুলনার অভ্যাসই মানুষকে নিজের প্রাপ্তিকে তুচ্ছ মনে করতে শেখায়। কৃতজ্ঞতা এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
কৃতজ্ঞ মানুষ যা নেই তা নিয়ে আফসোস করেন না, যা আছে তার মূল্য বোঝেন।
নবীজি (সা.) এ বিষয়ে একটা ব্যবহারিক পরামর্শ দিয়েছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচের অবস্থার মানুষের দিকে তাকাও, ওপরের অবস্থার মানুষের দিকে তাকিয়ো না। তাহলে আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ মনে করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)
৫. অহংকার থেকে বাঁচায়
কৃতজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের সব অর্জন আসলে আল্লাহর দান, নিজের একক কৃতিত্ব নয়। এই বোধ থাকলে মানুষ নিজের সাফল্য নিয়ে গর্বিত হয়ে অন্যকে তুচ্ছ ভাবার দিকে যায় না।
নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)
কৃতজ্ঞতা আর অহংকার—এই দুটো একসঙ্গে অন্তরে থাকতে পারে না।
৬. আখেরাতের জন্য প্রস্তুত করে
যিনি কৃতজ্ঞ, তিনি নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার নিয়েও সচেতন থাকেন—আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা কী উদ্দেশ্যে দিয়েছেন, আর তার হক কতটা আদায় হচ্ছে। এই আত্মজিজ্ঞাসাই মানুষকে আখেরাতের জবাবদিহির জন্য তৈরি করে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন বান্দার পা এক চুলও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন, জ্ঞান, সম্পদ আর শরীরের ব্যবহার নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)
প্রতিদিনের অভ্যাসে কৃতজ্ঞতা
কৃতজ্ঞতা একটা অভ্যাস, যা চর্চা করে গড়ে তুলতে হয়। দিনে একবার মনে মনে তিনটা ভালো জিনিসের কথা ভাবা, কারও সাহায্য পেলে মুখে স্পষ্ট ধন্যবাদ জানানো, নিজের চেয়ে কষ্টে থাকা মানুষের কথা একবার স্মরণ করা—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই অন্তরে কৃতজ্ঞতার ভিত গড়ে তোলে।
আর এই ভিতের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একজন মুমিনের প্রশান্ত, সন্তুষ্ট জীবন।
এডমিন 










