১২:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ, কোন খাতে কত বরাদ্দ?

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ১২:০৬:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
  • 1

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেট পেশ করলো শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। সোমবার (২২ জুন) বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৫.২৯ কোটি রুপির বাজেট ঘোষণা করেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মোট ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি রুপি।

বাজেটের উল্লেখযোগ্য সব বিষয়…

শূন্য পদে বড় নিয়োগ

রাজ্যে একাধিক আটকে থাকা শূন্য পদ নিয়ে বড় ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বলেন, রাজ্য সরকারের এক লাখ শূন্য পদে খুব শিগগির নিয়োগ শুরু হবে। নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষিত থাকবে ও ১০ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে অগ্নিবীরদের (সশস্ত্র বাহিনীতে ৪ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সৈন্যরা) জন্য। পুলিশ বিভাগের জন্য ২০ হাজার নিয়োগ বরাদ্দ থাকবে। আর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে ৫০ হাজার।

রাজ্য সরকারের কর্মীদের মহার্ঘ্য ভাতা বৃদ্ধি

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বর্তমানে ১৮ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার (ডিএ) সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ যোগ করা হবে। অর্থাৎ মোট ডিএ হার হবে ৩৮ শতাংশ, যা ১ অক্টোবর থেকে অর্থাৎ দুর্গাপূজার আগেই কার্যকর হবে। পেনশন প্রাপকরা অতিরিক্ত পাবেন।

রাজ্য সরকারি কর্মীদের অনেক দিনের দাবি ছিল, যে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের হারে ডিএ দেওয়া হোক রাজ্য সরকারি কর্মীদের। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা ৫৮ শতাংশ হারে ডিএ পান। সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের এই ঘোষণায় কেন্দ্রের সঙ্গে ফারাক অনেকটাই কমলো বলে মনে করা হচ্ছে।

ব্যবসাকে সিন্ডিকেট মুক্ত করতে আইন!

স্বপন জানান, হস্তক্ষেপ ও চাঁদাবাজির ফলে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। এই কারণে আগামী দিনে একটি আইন আনা হবে। ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ ও অন্য বেআইনি অর্থ আদায় থেকে রক্ষা করার আইন আনা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

নবায়নযোগ্য শক্তিতে মনোযোগ

এরপরেই অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা দেন, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত গাড়ির কারখানা তৈরি হবে। শিলিগুড়িতে ইন্টিগ্রেটেড লজিস্টিক হাব ও আইটি পার্ক গড়ে তোলা হবে। দুর্গাপুরে তৈরি হবে সেমি কন্ডাক্টর ইউনিট। দক্ষিণ দিনাজপুরে গড়ে তোলা হবে টেক্সটাইল হাব।

সব সামাজিক প্রকল্প চালু রাখার ঘোষণা

বাজেটে রাজ্যে চালু থাকা সব সামাজিক সুরক্ষাপ্রকল্প চালু থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মূল স্তম্ভ। রাজ্যের জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের। রাজ্য সরকার নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে ‘আপনার সরকার, আপনার পাশে’ নামে একটি নতুন প্রকল্প নিয়েছে।

মদের দোকান নিয়ে কড়াকড়ি

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মদের দোকানের নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হবে না। কলকাতা পৌরসভার ক্ষেত্রে এই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দূরত্ব হবে ৫০০ মিটার।

বেকার ভাতা ঘোষণা

বাজেটে ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যোগ্য-শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাসিক ভাতা দেওয়ার জন্য অক্টোবর থেকে ভরসা কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে স্নাতক বেকারদের জন্য মাসে ৩০০০ রুপি ও অন্যদের মাসে ২০০০ রুপি ভাতা দেওয়া হবে। যে পরিবারের আয় মাসিক এক লাখ টাকার কম ও যারা অন্য কোনো সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাদের জন্য এটি প্রযোজ্য হবে।

স্বাস্থ্যখাতে মেগাবাজেট

রাজ্য সরকার উত্তরবঙ্গে একটি এইমস (AIIMS) হাসপাতাল, সুন্দরবন ও পুরুলিয়া এবং দার্জিলিংয়ে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, উত্তরবঙ্গে একটি বিশেষ ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেবে রাজ্য সরকার। এছাড়া সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নীত করা হবে।

অন্যদিকে, ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে’র জন্য মোট ৩ হাজার ১০০ কোটি রুপি বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই স্কিমে আশা ও আইসিডিএস কর্মী এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সের সব নাগরিকসহ প্রায় ৭ কোটি মানুষ এর আওতায় আসবেন। যারা এই স্কিমের আওতায় আসবেন না, তাদের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ ফান্ড থেকে অর্থ সাহায্য করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচটি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব তৈরি করা হবে। সেইসঙ্গে হরিপাল, বামনগোলা, ফরাক্কা, দিঘা, ঝালদা, মানবাজারের বর্তমান হাসপাতালের আধুনিকীকরণ হবে।

বিধায়ক তহবিলে ১ কোটি!

বিধায়ক তহবিল ৭০ লাখ রুপি থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি রুপি করা হচ্ছে।

রাজ্যে নতুন পাঁচ জেলা

রাজ্যে মোট পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। এই পাঁচটি প্রস্তাবিত জেলা হল— কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগ। পাশাপাশি কাঁথিতে একটি নতুন পুলিশ জেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গোপীবল্লভপুরে তৈরি হবে নতুন মহকুমা। পাশাপাশি শিবমন্দির, গাজোল, চাঁচল, বেলদা, বাগনান, জয়গাঁ, কোলাঘাট, কামারপুকুর ও টুঙ্গিদিঘিতে নতুন পৌরসভা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নতুন বিমানবন্দর

রাজ্য সরকারের নতুন বাজেটে জোর দেওয়া হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও। কলকাতার কাছে আরও একটি বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। কল্যাণীর কাছে একটি ‘গ্রিনফিল্ড’ বিমানবন্দর তৈরি করতে ১০০০-১৫০০ একর জমি চিহ্নিত করবে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি কেন্দ্রের উড়ান প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট ও মালদহেও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

শিক্ষাখাতের বাজেট

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিনাখরচের কোচিং সেন্টার চালু হবে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় তৈরি হবে বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার। রাজ্যে আদর্শ বিদ্যালয় তৈরির জন্য ২১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হচ্ছে।

সংস্কৃত কলেজ ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫০ কোটি রুপি। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দুটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে।

ঝাড়গ্রামে মূলত ১৫০ কোটি রুপি ব্যয়ে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হবে। তার জন্য চলতি অর্থবর্ষে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে

উত্তরবঙ্গে স্টেডিয়াম

উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের দুটি স্টেডিয়াম তৈরি করা হবে, যার একটি হবে ইনডোর। ক্রীড়া সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ‘রাজ্যে খেলো ইন্ডিয়া’ কার্যক্রম শুরু হবে। রাজ্যে প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় ৫ কোটি রুপি ব্যয়ে মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে।

মিড ডে মিল

প্রাথমিক স্কুলে মিড ডে মিলের উপকরণের খরচ ১০ রুপি করা হবে। ইসকনের সহযোগিতায় কলকাতা পুরসভা এলাকায় স্কুলে পুষ্টিকর রান্না করে মিড ডে মিল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মিড ডে মিলের রাঁধুনিদের ১ হাজার রুপি বৃদ্ধি করা হবে।

আশাকর্মী ও সিভিক ভলানটিয়ারদের সম্মানী বৃদ্ধি

আশাকর্মীদের কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের মাসিক সাম্মানিক ৫০০০ রুপি বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী স্বপন। অন্যদিকে, স্টেট ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক কনডাক্টরদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে মাসে ১৬ হাজার রুপি করা হবে। সিভিক ভলানটিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশদের পারিশ্রমিক ২০০০ রুপি করে বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। হোমগার্ডদেরও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে ২০০০ রুপি।

বয়স্ক-বিধবাদের ভাতা ৫০০ রুপি বৃদ্ধি

বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষমদের মাসিক ভাতা ৫০০ রুপি করে বৃদ্ধির ঘোষণা করা হলো বাজেটে।

বিনামূল্যে বাস পরিষেবায় বরাদ্দ ৫৫০ কোটি

নারীদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫৫০ কোটি রুপি। এই উদ্দেশ্যে শিগগির পিঙ্ক কার্ড চালু করা হবে বলে ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী।

এক নজরে ৪ লাখ কোটি রুপির বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য মোট ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে। এর মধ্যে কৃষিতে ৮,৫৬৫.৮৪ কোটি রুপি, কৃষি বিপণনে ৩৬৮.৯৯ কোটি রুপি, প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে ১,৪০৪.৪২ কোটি রুপি, অনগ্রসর শ্রেণি উন্নয়নে ২,৫৪৪.৪৮ কোটি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন বিষয়ক কাজের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১,২৮০.০৭ কোটি রুপি। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছে ১,৮২১.৫২ কোটি রুপি। সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ হয়েছে ২,১৬৫.৪২ কোটি রুপি। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নে ৫১,৮৩৬.৫৫ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। শিল্প বাণিজ্য ও শিল্পোদ্যোগে বরাদ্দ হয়েছে ৩,২৬৬.৫৯ কোটি রুপি।

জরুরি পরিষেবার জন্য প্রতিটি থানায় একটি করে গাড়ি চালু করা হবে। তাতে বরাদ্দ হয়েছে ১০০ কোটি রুপি। রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ ও সহজ করতে ৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। বন্যা প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের জন্য ৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনায় বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার কমাতে নতুন প্রকল্প চালু হবে। সরকারি ও সরকারপোষিত কলেজে অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। এর জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১০০০ কোটি রুপি। প্রসূতিদের উন্নত পুষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী মাত্রুবন্দনা যোজনার সাহায্য-সহ ২১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ। নারীদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ।

১২৫ দিনের কাজের জন্য রাজ্য সরকারের ১৪ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ। আবাস যোজনা (গ্রামীণ)-এর জন্য ১৩ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে।

হুগলি-ভাগীরথী নদীর উপর জেটি উন্নয়ন, জেটি ও গ্রামীণ বাজারের যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ। সুন্দরবনে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিষেবা আরও উন্নত করতে ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারি অফিসগুলিতে সৌরশক্তির গ্রিড বসানো হবে। তার জন্য ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে। মুড়িগঙ্গায় সেতু নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি রুপি। আদর্শ স্কুল গঠনের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ২১০০ কোটি রুপি।

ডিডি/এসএএইচ

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ, কোন খাতে কত বরাদ্দ?

আপডেট সময়ঃ ১২:০৬:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেট পেশ করলো শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। সোমবার (২২ জুন) বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৫.২৯ কোটি রুপির বাজেট ঘোষণা করেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মোট ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি রুপি।

বাজেটের উল্লেখযোগ্য সব বিষয়…

শূন্য পদে বড় নিয়োগ

রাজ্যে একাধিক আটকে থাকা শূন্য পদ নিয়ে বড় ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বলেন, রাজ্য সরকারের এক লাখ শূন্য পদে খুব শিগগির নিয়োগ শুরু হবে। নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষিত থাকবে ও ১০ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে অগ্নিবীরদের (সশস্ত্র বাহিনীতে ৪ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সৈন্যরা) জন্য। পুলিশ বিভাগের জন্য ২০ হাজার নিয়োগ বরাদ্দ থাকবে। আর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে ৫০ হাজার।

রাজ্য সরকারের কর্মীদের মহার্ঘ্য ভাতা বৃদ্ধি

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, বর্তমানে ১৮ শতাংশ মহার্ঘ ভাতার (ডিএ) সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ যোগ করা হবে। অর্থাৎ মোট ডিএ হার হবে ৩৮ শতাংশ, যা ১ অক্টোবর থেকে অর্থাৎ দুর্গাপূজার আগেই কার্যকর হবে। পেনশন প্রাপকরা অতিরিক্ত পাবেন।

রাজ্য সরকারি কর্মীদের অনেক দিনের দাবি ছিল, যে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের হারে ডিএ দেওয়া হোক রাজ্য সরকারি কর্মীদের। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীরা ৫৮ শতাংশ হারে ডিএ পান। সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের এই ঘোষণায় কেন্দ্রের সঙ্গে ফারাক অনেকটাই কমলো বলে মনে করা হচ্ছে।

ব্যবসাকে সিন্ডিকেট মুক্ত করতে আইন!

স্বপন জানান, হস্তক্ষেপ ও চাঁদাবাজির ফলে ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। এই কারণে আগামী দিনে একটি আইন আনা হবে। ব্যবসাকে সিন্ডিকেট চার্জ ও অন্য বেআইনি অর্থ আদায় থেকে রক্ষা করার আইন আনা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

নবায়নযোগ্য শক্তিতে মনোযোগ

এরপরেই অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা দেন, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত গাড়ির কারখানা তৈরি হবে। শিলিগুড়িতে ইন্টিগ্রেটেড লজিস্টিক হাব ও আইটি পার্ক গড়ে তোলা হবে। দুর্গাপুরে তৈরি হবে সেমি কন্ডাক্টর ইউনিট। দক্ষিণ দিনাজপুরে গড়ে তোলা হবে টেক্সটাইল হাব।

সব সামাজিক প্রকল্প চালু রাখার ঘোষণা

বাজেটে রাজ্যে চালু থাকা সব সামাজিক সুরক্ষাপ্রকল্প চালু থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মূল স্তম্ভ। রাজ্যের জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে আমাদের। রাজ্য সরকার নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে ‘আপনার সরকার, আপনার পাশে’ নামে একটি নতুন প্রকল্প নিয়েছে।

মদের দোকান নিয়ে কড়াকড়ি

অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানের এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মদের দোকানের নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হবে না। কলকাতা পৌরসভার ক্ষেত্রে এই লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দূরত্ব হবে ৫০০ মিটার।

বেকার ভাতা ঘোষণা

বাজেটে ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যোগ্য-শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাসিক ভাতা দেওয়ার জন্য অক্টোবর থেকে ভরসা কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে স্নাতক বেকারদের জন্য মাসে ৩০০০ রুপি ও অন্যদের মাসে ২০০০ রুপি ভাতা দেওয়া হবে। যে পরিবারের আয় মাসিক এক লাখ টাকার কম ও যারা অন্য কোনো সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাদের জন্য এটি প্রযোজ্য হবে।

স্বাস্থ্যখাতে মেগাবাজেট

রাজ্য সরকার উত্তরবঙ্গে একটি এইমস (AIIMS) হাসপাতাল, সুন্দরবন ও পুরুলিয়া এবং দার্জিলিংয়ে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, উত্তরবঙ্গে একটি বিশেষ ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেবে রাজ্য সরকার। এছাড়া সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উন্নীত করা হবে।

অন্যদিকে, ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে’র জন্য মোট ৩ হাজার ১০০ কোটি রুপি বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই স্কিমে আশা ও আইসিডিএস কর্মী এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সের সব নাগরিকসহ প্রায় ৭ কোটি মানুষ এর আওতায় আসবেন। যারা এই স্কিমের আওতায় আসবেন না, তাদের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ ফান্ড থেকে অর্থ সাহায্য করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচটি আঞ্চলিক মেডিক্যাল হাব তৈরি করা হবে। সেইসঙ্গে হরিপাল, বামনগোলা, ফরাক্কা, দিঘা, ঝালদা, মানবাজারের বর্তমান হাসপাতালের আধুনিকীকরণ হবে।

বিধায়ক তহবিলে ১ কোটি!

বিধায়ক তহবিল ৭০ লাখ রুপি থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি রুপি করা হচ্ছে।

রাজ্যে নতুন পাঁচ জেলা

রাজ্যে মোট পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। এই পাঁচটি প্রস্তাবিত জেলা হল— কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগ। পাশাপাশি কাঁথিতে একটি নতুন পুলিশ জেলা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গোপীবল্লভপুরে তৈরি হবে নতুন মহকুমা। পাশাপাশি শিবমন্দির, গাজোল, চাঁচল, বেলদা, বাগনান, জয়গাঁ, কোলাঘাট, কামারপুকুর ও টুঙ্গিদিঘিতে নতুন পৌরসভা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নতুন বিমানবন্দর

রাজ্য সরকারের নতুন বাজেটে জোর দেওয়া হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও। কলকাতার কাছে আরও একটি বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। কল্যাণীর কাছে একটি ‘গ্রিনফিল্ড’ বিমানবন্দর তৈরি করতে ১০০০-১৫০০ একর জমি চিহ্নিত করবে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি কেন্দ্রের উড়ান প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট ও মালদহেও বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

শিক্ষাখাতের বাজেট

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিনাখরচের কোচিং সেন্টার চালু হবে। রাজ্যের প্রতিটি জেলায় তৈরি হবে বিনামূল্যের কোচিং সেন্টার। রাজ্যে আদর্শ বিদ্যালয় তৈরির জন্য ২১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হচ্ছে।

সংস্কৃত কলেজ ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫০ কোটি রুপি। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দুটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে।

ঝাড়গ্রামে মূলত ১৫০ কোটি রুপি ব্যয়ে আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হবে। তার জন্য চলতি অর্থবর্ষে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে

উত্তরবঙ্গে স্টেডিয়াম

উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের দুটি স্টেডিয়াম তৈরি করা হবে, যার একটি হবে ইনডোর। ক্রীড়া সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ‘রাজ্যে খেলো ইন্ডিয়া’ কার্যক্রম শুরু হবে। রাজ্যে প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় ৫ কোটি রুপি ব্যয়ে মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরি হবে।

মিড ডে মিল

প্রাথমিক স্কুলে মিড ডে মিলের উপকরণের খরচ ১০ রুপি করা হবে। ইসকনের সহযোগিতায় কলকাতা পুরসভা এলাকায় স্কুলে পুষ্টিকর রান্না করে মিড ডে মিল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মিড ডে মিলের রাঁধুনিদের ১ হাজার রুপি বৃদ্ধি করা হবে।

আশাকর্মী ও সিভিক ভলানটিয়ারদের সম্মানী বৃদ্ধি

আশাকর্মীদের কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের মাসিক সাম্মানিক ৫০০০ রুপি বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী স্বপন। অন্যদিকে, স্টেট ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক কনডাক্টরদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে মাসে ১৬ হাজার রুপি করা হবে। সিভিক ভলানটিয়ার, ভিলেজ পুলিশ ও গ্রিন পুলিশদের পারিশ্রমিক ২০০০ রুপি করে বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। হোমগার্ডদেরও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে ২০০০ রুপি।

বয়স্ক-বিধবাদের ভাতা ৫০০ রুপি বৃদ্ধি

বয়স্ক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষমদের মাসিক ভাতা ৫০০ রুপি করে বৃদ্ধির ঘোষণা করা হলো বাজেটে।

বিনামূল্যে বাস পরিষেবায় বরাদ্দ ৫৫০ কোটি

নারীদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে ৫৫০ কোটি রুপি। এই উদ্দেশ্যে শিগগির পিঙ্ক কার্ড চালু করা হবে বলে ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী।

এক নজরে ৪ লাখ কোটি রুপির বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য মোট ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে। এর মধ্যে কৃষিতে ৮,৫৬৫.৮৪ কোটি রুপি, কৃষি বিপণনে ৩৬৮.৯৯ কোটি রুপি, প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে ১,৪০৪.৪২ কোটি রুপি, অনগ্রসর শ্রেণি উন্নয়নে ২,৫৪৪.৪৮ কোটি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন বিষয়ক কাজের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১,২৮০.০৭ কোটি রুপি। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছে ১,৮২১.৫২ কোটি রুপি। সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ হয়েছে ২,১৬৫.৪২ কোটি রুপি। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নে ৫১,৮৩৬.৫৫ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। শিল্প বাণিজ্য ও শিল্পোদ্যোগে বরাদ্দ হয়েছে ৩,২৬৬.৫৯ কোটি রুপি।

জরুরি পরিষেবার জন্য প্রতিটি থানায় একটি করে গাড়ি চালু করা হবে। তাতে বরাদ্দ হয়েছে ১০০ কোটি রুপি। রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ ও সহজ করতে ৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। বন্যা প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের জন্য ৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনায় বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীদের স্কুলছুটের হার কমাতে নতুন প্রকল্প চালু হবে। সরকারি ও সরকারপোষিত কলেজে অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। এর জন্য বরাদ্দ হয়েছে ১০০০ কোটি রুপি। প্রসূতিদের উন্নত পুষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রী মাত্রুবন্দনা যোজনার সাহায্য-সহ ২১ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ। নারীদের বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ।

১২৫ দিনের কাজের জন্য রাজ্য সরকারের ১৪ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ। আবাস যোজনা (গ্রামীণ)-এর জন্য ১৩ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে।

হুগলি-ভাগীরথী নদীর উপর জেটি উন্নয়ন, জেটি ও গ্রামীণ বাজারের যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ। সুন্দরবনে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিষেবা আরও উন্নত করতে ২০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারি অফিসগুলিতে সৌরশক্তির গ্রিড বসানো হবে। তার জন্য ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছে। মুড়িগঙ্গায় সেতু নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি রুপি। আদর্শ স্কুল গঠনের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ২১০০ কোটি রুপি।

ডিডি/এসএএইচ