কানসাস সিটির খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র, আমেরিকান সকার এনএফএলের কানসাস সিটি চিফসের ঘরের মাঠ এবং বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত আমেরিকান ফুটবলের ভেন্যু- অ্যারোহেড স্টেডিয়াম।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের কানসাস সিটিতে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি ১৯৭২ সাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। বর্তমানে এটি আমেরিকান ফুটবল কনফারেন্সের (এএফসি) সবচেয়ে পুরোনো স্টেডিয়াম।
৭৬ হাজার ৪১৬ জন দর্শক ধারণক্ষমতার এই ভেন্যু যুক্তরাষ্ট্রের ২৫তম বৃহত্তম এবং এনএফএলের চতুর্থ বৃহত্তম স্টেডিয়াম। একই সঙ্গে এটি মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া স্থাপনাও। ২০১০ সালে ৩৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয় স্টেডিয়ামটির।
২০২১ সালের মার্চে জিইএইচএর সঙ্গে নামকরণ স্বত্ব চুক্তির পর স্টেডিয়ামটির বিকল্প নাম হয় ‘জিইএইচএ ফিল্ড অ্যাট অ্যারোহেড স্টেডিয়াম’। ২০২১ মৌসুমের শুরুতে কার্যকর হওয়া এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০৩১ সালের জানুয়ারিতে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম ভেন্যু কানসাসের এই অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। যদিও ফিফার বিপণন নীতির কারণে টুর্নামেন্ট চলাকালে স্টেডিয়ামটি ‘কানসাস সিটি স্টেডিয়াম’ নামে পরিচিত হবে। এর আগে বিভিন্ন ফুটবল ম্যাচ এবং আঞ্চলিক কলেজ ফুটবল ম্যাচও আয়োজন করেছে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামটি।
ইতিহাসের শুরু
১৯৬৩ সালে আমেরিকান ফুটবল লিগের ডালাস টেক্সান্স দল কানসাস সিটিতে স্থানান্তরিত হয়ে নতুন নাম নেয় কানসাস সিটি চিফস। তখন তারা নিজেদের ঘরের ম্যাচ খেলত মিউনিসিপাল স্টেডিয়ামে। সেই মাঠে মেজর লিগ বেসবলের কানসাস সিটি অ্যাথলেটিক্সও খেলত। তবে ১৯৬৭ মৌসুম শেষে দলটি ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে চলে গেলে নতুন বেসবল দল কানসাস সিটি রয়্যালস যোগ দেয় ১৯৬৯ সালে।

১৯২৩ সালে নির্মিত এবং ১৯৫৫ সালে বড় সংস্কার হওয়া মিউনিসিপাল স্টেডিয়ামে ফুটবলের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার দর্শক বসতে পারতেন; কিন্তু ১৯৬৬ সালে ঘোষিত এএফএল-এনএফএল একীভূতকরণের পর এনএফএল স্টেডিয়ামের ন্যূনতম ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার নির্ধারণ করা হয়। ফলে নতুন স্টেডিয়ামের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
১৯৬৭ সালে ভোটাররা ১০২ মিলিয়ন ডলারের বন্ড অনুমোদন দেন দুটি স্টেডিয়াম নিয়ে নতুন ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য। প্রথম পরিকল্পনায় ছিল একটি সাধারণ চলমান ছাদবিশিষ্ট পাশাপাশি ফুটবল ও বেসবল স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হবে; কিন্তু পরিকল্পনাটি অতিরিক্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। পরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে আলাদা দুটি স্টেডিয়াম নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।
নির্মাণ ও নকশা
১৯৬৮ সালে শুরু হয় নির্মাণ কাজ। প্রথম নকশা করেছিলেন ডেনভারের স্থপতি চার্লস ডিয়েটন। পরে কানসাস সিটির স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান কিভেট অ্যান্ড মায়ার্স তা বাস্তবায়ন করে। ফুটবল ও বেসবল স্টেডিয়ামের নকশা আলাদা হলেও পার্কিং, ইউটিলিটি এবং ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার যৌথভাবে ব্যবহার করা হয়।

কানসাস সিটি চিফসের প্রতিষ্ঠাতা লামার হান্ট ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তিন শয়নকক্ষ, রান্নাঘর, বাথরুম ও বসার ঘরসহ একটি মালিকানাধীন স্যুট যোগ করেছিলেন। দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর জন্য স্টেডিয়ামের উপরের অংশ অত্যন্ত খাড়া ঢালে নির্মাণ করা হয়। তবে আধুনিক স্টেডিয়ামে বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে এমনটি আর করা সম্ভব নয়।
উদ্বোধন ও শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা
১৯৭২ মৌসুম শুরুর আগেই স্টেডিয়ামের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১২ আগস্ট ১৯৭২ সালে উদ্বোধন করা হয় স্টেডিয়ামটি। ম্যাচটি ছিল প্রাক-মৌসুমের। এই ম্যাচে চিফস ২৪-১৪ ব্যবধানে হারায় সেন্ট লুইস কার্ডিনালসকে।
একই বছরের প্রথম নিয়মিত মৌসুমের ম্যাচে মিয়ামি ডলফিনসের কাছে হারে চিফস। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মিউনিসিপাল স্টেডিয়ামে চিফসের শেষ ম্যাচেও প্রতিপক্ষ ছিল ডলফিনস। ১৯৭১ সালের বড়দিনে অনুষ্ঠিত সেই দ্বৈত অতিরিক্ত সময়ের প্লে-অফ ম্যাচটি এখনও এনএফএল ইতিহাসের দীর্ঘতম ম্যাচ।
৫ নভেম্বর ১৯৭২ সালে ৮২ হাজার ৯৪ জন দর্শক উপস্থিত থেকে দেখেন চিফসের ২৭-১৪ ব্যবধানে ওকল্যান্ড রেইডার্সকে হারানোর ম্যাচটি। এটি এখনও অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির রেকর্ড।
১৯৭৩ সালে এনএফএলে প্রথমবারের মতো মাঠের ইয়ার্ড মার্কারে নিকটবর্তী গোললাইন নির্দেশক তীর চিহ্ন ব্যবহার করা হয় অ্যারোহেডে। পরে এটি পুরো এনএফএলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ১৯৭৮ সালে বাধ্যতামূলক করা হয়।
প্রযুক্তি ও আধুনিকায়ন
১৯৯১ সালে স্টেডিয়ামে ফুটবলের আকৃতির দুটি ‘ডায়মন্ড ভিশন’ পর্দা বসানো হয়। ১৯৯৪ সালে কৃত্রিম অ্যাস্ট্রোটার্ফের পরিবর্তে প্রাকৃতিক ঘাস স্থাপন করা হয়।
২০০৯ সালে ড্যাকট্রনিকসের সমন্বিত বহু-মিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি ব্যবস্থা যোগ করা হয়। দুই প্রান্তে হাই-রেজ্যুলেশনের ভিডিও ডিসপ্লে বসানো হয় এবং প্রায় ১ হাজার ৬২৫ ফুট ডিজিটাল রিবন বোর্ড স্থাপন করা হয়।
২০১৩ সালে ‘নর্থব্রিজ বারমুডাগ্রাস’ নামে নতুন ঘাস ব্যবহার শুরু করে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ। ঠান্ডা আবহাওয়ায় টিকে থাকা, দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং শক্ত শিকড় তৈরির ক্ষমতার জন্য এই পরিবর্তন আনা হয়।
শব্দের রেকর্ড
অ্যারোহেড স্টেডিয়াম বিশ্বের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ স্টেডিয়াম হিসেবেও পরিচিত। ১৯৯০ সালে ডেনভার ব্রঙ্কোসের বিপক্ষে এক ম্যাচে অতিরিক্ত দর্শক শব্দের কারণে রেফারি কানসাস সিটিকে শাস্তির হুমকি দিয়েছিলেন।
১৩ অক্টোবর ২০১৩ সালে ওকল্যান্ড রেইডার্সের বিপক্ষে ম্যাচে দর্শকদের শব্দমাত্রা পৌঁছায় ১৩৭.৫ ডেসিবেলে, যা গিনেস বুকে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। পরে সিয়াটল সিহকসের সমর্থকরা ১৩৭.৬ ডেসিবল তুলে সেই রেকর্ড ভাঙেন। তবে ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের বিপক্ষে সোমবার রাতের ম্যাচে ১৪২.২ ডেসিবেল শব্দ তুলে রেকর্ড পুনরুদ্ধার করে চিফস সমর্থকরা।
কলেজ ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু
অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে পাঁচটি ‘বিগ-১২ কনফারেন্স’ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া কানসাস জয়হকস ও মিসৌরি টাইগার্সের ঐতিহ্যবাহী ‘বর্ডার ওয়ার’ ম্যাচও আয়োজিত হয়েছে এখানে।

২০০৭ সালে দুই দলের বহুল আলোচিত ম্যাচ ‘অ্যারোহেড আর্মাগেডন’ নামে পরিচিতি পায়। সেই ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন ৮০ হাজার ৫৩৭ দর্শক, যা স্টেডিয়ামের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
ফুটবলের স্মৃতি
১৯৯৬ সালে মেজর লিগ সকার চালু হলে কানসাস সিটি উইজ দলের ঘরের মাঠে পরিণত হয় অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। পরে দলটির নাম হয় উইজার্ডস। ২০১০ সালে এখানে অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ২-১ ব্যবধানে হারায় কানসাস সিটি। ম্যাচটিতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে একমাত্র গোল করেন দিমিত্রি বারবাতভ।
২০২৪ সালের ১৩ এপ্রিল লিওনেল মেসির ইন্টার মিয়ামি এবং স্পোর্টিং কানসাস সিটির ম্যাচেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। ৭২ হাজার ৬১০ দর্শকের উপস্থিতিতে ম্যাচটি মেজর লিগ সকার ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ দর্শকসংখ্যার রেকর্ড গড়ে।
২০২৬ বিশ্বকাপ
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজিত ২০২৬ বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুর একটি অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। এখানে হবে ছয়টি ম্যাচ- চারটি গ্রুপ পর্ব, একটি শেষ ৩২ এবং একটি কোয়ার্টার ফাইনাল।
বিশ্বকাপ সামনে রেখে স্টেডিয়ামে কিছু সংস্কার করা হয়। ফিফার মাঠসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলতে প্রান্তিক আসন কমানো হয়, গণমাধ্যম ও আতিথেয়তার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা হয় এবং মাঠের বায়ু চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়।
সংস্কার ও অর্থায়ন
২০০৬ সালে ভোটাররা ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের সংস্কারের জন্য কর বৃদ্ধি অনুমোদন করেন। এরপর চিফসের সঙ্গে নতুন চুক্তি হয়, যাতে দলটি অন্তত ২০৩১ সাল পর্যন্ত অ্যারোহেডে থাকার নিশ্চয়তা দেয়। ২০০৭ সালে ঘোষিত ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের সংস্কারে যুক্ত হয় ‘চিফস হল অব অনার’, লামার হান্টের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন আসনব্যবস্থা।
২০১৯ সালে নিচতলার আসন পরিবর্তন, নতুন ভিডিও বোর্ড এবং ড্রেসিংরুম সংস্কারের ঘোষণা আসে। ২০২৪ সালে আরও বড় সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হলেও বিক্রয় কর বৃদ্ধি অনুমোদন না পাওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
২২ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে কানসাস সিটি চিফস ঘোষণা দেয় যে তারা ২০৩১ মৌসুমের আগে কানসাস অঙ্গরাজ্যের ওয়ায়ানডট কাউন্টিতে নতুন স্টেডিয়ামে চলে যেতে চায়। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ মৌসুমের পর অ্যারোহেড স্টেডিয়াম ভেঙে ফেলা হতে পারে।
সংগীত ও সংস্কৃতি
১৯৬৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ‘টিডি প্যাক ব্যান্ড’ ছিল চিফসের ঘরের ম্যাচগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। দলের জন্য বিশেষ গানও লিখেছিলেন ব্যান্ড প্রতিষ্ঠাতা টনি ডিপার্ডো।
২০১৮ সালে টেইলর সুইফট তার ‘রেপুটেশন স্টেডিয়াম ট্যুর’ আয়োজন করেন এখানে। ২০২৩ সালে আবারও দুই রাতের ‘এরাস ট্যুর’ অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরে বিয়ন্সে তার ‘রেনেসাঁ বিশ্ব সফর’-এর সমাপ্তি করেন এই স্টেডিয়ামে।
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের সূচি
বি.দ্র: সূচি বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী।
গ্রুপ পর্ব
১৬ জুন, আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া, সকাল ৭টা (১৭ জুন)
২০ জুন, ইকুয়েডর-কুরাসাও, সকাল ৬টা (২১ জুন)
২৫ জুন, তিউনিসিয়া-নেদারল্যান্ডস, ভোর ৫টা (২৬ জুন)
২৭ জুন, আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া, সকাল ৮টা (২৮ জুন)
নকআউট (শেষ-৩২)
৩ জুলাই, শেষ ৩২ ম্যাচ-১৬, সকাল ৭টা ৩০ মিনিট (৪ জুলাই)
কোয়ার্টার ফাইনাল
১১ জুলাই, কোয়ার্টার ফাইনাল –৪, সকাল ৭টা (১২ জুলাই)
আইএইচএস/
এডমিন 


















