০২:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একটি ছোট্ট কালো স্যান্ডেল, হ্যাঁচকা টান ও রামিসা

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:০৩:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • 3

রাজধানীর পল্লবীর ৭ নম্বর সড়কের ৩৭ নম্বরের বাসা। তৃতীয় তলায় ফ্ল্যাট নম্বর ৩-এ। দরজার হাতখানেক দূরে একটি ছোট্ট কালো স্যান্ডেল, যেটি পরতো রামিসা। আরেকটি পায়ে গলানোর আগেই হ্যাঁচকা টানে পাশের ফ্ল্যাটে টেনে নেন সোহেল রানা।

এর পরের গল্পগুলো রামিসার স্যান্ডেলের কালো রঙের মতো। যে গল্প চোখ বন্ধ করলে দম আটকে দেয়। পৃথিবীকে দুর্জন মনে হয়। যে গল্প ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশজুড়ে। কাঁদছে, কাঁদাচ্ছে কোটি হৃদয়।

বাড়ির নিচে কলাপসিবল গেট। ওপরে ঝুলছে একটি সাদা ব্যানার। ব্যানারে ফুটফুটে সুন্দর রামিসার মিষ্টি হাসির ছবি। যে হাসি ফুল হয়ে ফুটছে। ব্যানারে লেখা ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই। হত্যাকারীর জনসম্মুখে ফাঁসি চাই।’

রামিসা পড়তো পপুলার মডেল হাসি স্কুলে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে। রোল নম্বর ছিল ১। মেধাবী এ শিশু শিক্ষার্থীর পৃথিবীর কোনো স্বার্থ কিংবা দ্বন্দ্বে ছিল না কোনো ভূমিকা। অথচ তার সঙ্গেই ঘটেছে এক পাশবিক নৃশংসতা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে গিয়ে দেখা যায় কালো স্যান্ডেল জোড়ার একটি বাঁকা হয়ে রামিসাদের দরকার দিকে মুখ করা। অপর পাশের ফ্ল্যাটের কোনো নম্বর নেই। যেখানে ছিল ঘাতকের বাস। যেখানে একটি তাজা ফুল ঝরে গেছে অকালে। দরজা নক করা হলে মিনিট পাঁচেক পর খুলে দেন রামিসার চাচা মো. সালাহ উদ্দিন। কথা হলো বাইরে দাঁড়িয়ে। ভিতরে ঢোকানোর মতো অবস্থায় তারা নেই।

রামিসারামিসাদের ফ্ল্যাটের সামনে কালো জুতা, অপর পাশের ফ্ল্যাটেই তার ওপর চলে পাশবিক নির্যাতন

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার এলেন। প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা-বাবা। বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবারজুড়ে। ভারী হয়ে উঠেছে পল্লবীর ছোট্ট এ বাসাটি।

ছোট্ট রামিসার প্রতিদিনের চাহিদা ছিল ১০ টাকা। টিফিন বা তার প্রিয় খাবার খেতো সে। মেয়ের সেই গল্প বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি রামিসার বাবা। শুধু চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

রামিসার মা পারভীন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। প্রতিদিন অনেক টাকার ওষুধ খেতে হয়। রামিসা বলতো ও বড় হয়ে ডাক্তার হবে। আমার চিকিৎসা করবে। কিন্তু ডাক্তার আর হইতে পারলো না আমার মেয়ে।

বিচার ব্যবস্থার ওপর আক্ষেপ প্রকাশ করে রামিসার মা ও বাবা বলেন, বিচার চাইয়া এখন কি হবে? আমাদের কলিজার টুকরা চলে গেছে বিচার দিয়া কি এহন?

রামিসারামিসার চাচা

রামিসার চাচা মো. সালাহ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, রামিসার বাবা-মা ঘণ্টায় ঘণ্টায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। দুদিন ধরে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, তাও কান্না থামছে না। দাফন শেষ করে কবরের পাশ থেকে রামিসার বাবাকে টেনে তুলতে আনতে পারি না। খাওয়া-দাওয়ায় করতে চাচ্ছে না। শুধু পানি মুখে তুলে দিচ্ছি কষ্ট করে।

শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। যেহেতু আসামি নিজে জবানবন্দি দিয়েছেন, এর পরে তো আর কোনো সাক্ষী-তদন্তের দরকার নেই।

বেশি কথা তার বাবা-মায়ের পক্ষে বলা সম্ভব ছিল না। রামিসার মা বলছিলেন, মেয়ে রুম থেকে বের হওয়ার পর হ্যাঁচকা টানে হয়তো ঘাতক তাকে টেনে নিয়ে যায়। যাতে শেষ হয়ে যায় তার সব। পাশের ফ্ল্যাট থেকে মেয়ের চিৎকার শুনেও বোঝেননি তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

রামিসার বাসার সামনেও তখন চলছিল বিক্ষোভ। এলাকাবাসী সোনিয়া আক্তার নিপু জাগো নিউজকে বলেন, আমার তিন ছেলেমেয়ে। থাকি পল্লবীতেই। এখন আমাদের নিরাপত্তা নেই। বাচ্চা রেখে যে ওয়াশরুমে যাবো সেই নিরাপত্তাও নেই। স্বামীকে বিশ্বাস নেই, বাবাকেও বিশ্বাস নেই। আমার বাচ্চাদের স্কুলেই পাঠাবো না। মানুষের প্রতি বিশ্বাস উঠে গেছে। ঘরেও নিরাপত্তা নেই বাইরেও নিরাপত্তা নেই।’

রামিসা

চার বছরের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে ফাঁসির রায়ের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রিয়া মনি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, রামিসার ঘটনার ছবি দেইখা আমার স্বামী আমাকে বলেছে ঘরের বাইরে যেন আমি কাজে না যাই। সব সময় বাসায় বাচ্চার সঙ্গে থাকি। কতটা ভয় নিয়ে আমার স্বামী একথা বলতে পারে। সেখানে রামিসার বাবা বলেছে- সে বিচার চায় না।

তিনি বলেন, আমার বাচ্চাকে কার কাছে দিয়ে যাবো তার কোনো গ্যারান্টি আছে? বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার আমি দেখি নাই। পুলিশ ধরছে এরপর ছয় মাস, এক বছর জেল খাটছে এরপর আবার বাইর হয়ে গেছে। বাইরে আইসা আবার অপরাধ করতেছে। রামিসার সঙ্গে যে খারাপ কাজ করেছে তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফাঁসি চাই।

আরও পড়ুন

শিশু রামিসার বাসায় গেলেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন দ্রুত বিচারের আশ্বাস
চিৎকার শুনেছিলাম, সেটা যে আমার মেয়ে বুঝতে পারিনি: রামিসার মা
বড় বোনের পিছে পিছে বের হওয়াই কাল হলো রামিসার

রামিসার বাসার সামনে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ঋসা জাগো নিউজকে বলেন, আমি বাসা থেকে বের হলে আমার বাবা-মা টেনশন করে। তারা আমাকে বলেছে ব্যাগে ছুরি-কাচি নিতে নিজের সেফটির জন্য। বছরের পর বছর এমন নারী-শিশু ধর্ষণের ঘটনা দেখেই আসছি। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হয় না। আমরা ভোট দেই আমাদের নিরাপত্তার জন্য, কিন্তু কোনো সরকারই নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে না, পরিবর্তন নেই।

আইনমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে এই শিক্ষার্থী বলেন, আসামি স্বীকার করেছে, সেখানে সাতদিনের আবার কীসের ইনভেস্টিগেশন। সঙ্গে সঙ্গে জনসম্মুখে এনে আসামিকে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হতো তাহলে রামিসাকে এভাবে চলে যেতে হতো না। রামিসার বাবা-মাকে এভাবে কষ্ট পেতে হতো না।

বৃহস্পতিবার রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পপুলার মডেল স্কুলে যান। সেখানে গিয়ে রামিসার সহপাঠীদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদেন। তার সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ে রামিসার সহপাঠীরাও। একে অপরকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কান্না যেন কারোরই থামছিল না।

কান্না করতে করতে রামিসার সহপাঠীরা বলে, রামিসাকে কখনোই ভোলা যাবে না। এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। খুনি যেন কোনোভাবেই পার না পায়।

রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। এমন নৃশংসতার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। পল্লবী ও মিরপুরে আলাদাভাবে বিক্ষোভ করে সহপাঠী ওএলাকাবাসী।

রামিসা

বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করে অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এসময় থানা পুলিশ এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, শিশুটি হত্যার পর মরদেহ গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যদিও ফ্ল্যাটের ভেতর থেকেই দেহের অংশ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলেন পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬)।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল ও তার সহযোগী স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে এ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

যে যত কথাই বলুক বিচারহীনতা এ দেশের সংস্কৃতি। অনেক আলোচিত, হৃদয়স্পর্শী ঘটনা কখনো আলোর মুখ দেখেনি। মৃত্যুর দুদিন পর দরজার সামনে পড়ে থাকা এক পাটি ছোট্ট কালো স্যান্ডেল জড় পদার্থ হয়েও হয়তো অনেক কিছু বলে দেয়।

টিটি/এএসএ

ট্যাগঃ

একটি ছোট্ট কালো স্যান্ডেল, হ্যাঁচকা টান ও রামিসা

আপডেট সময়ঃ ০৬:০৩:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

রাজধানীর পল্লবীর ৭ নম্বর সড়কের ৩৭ নম্বরের বাসা। তৃতীয় তলায় ফ্ল্যাট নম্বর ৩-এ। দরজার হাতখানেক দূরে একটি ছোট্ট কালো স্যান্ডেল, যেটি পরতো রামিসা। আরেকটি পায়ে গলানোর আগেই হ্যাঁচকা টানে পাশের ফ্ল্যাটে টেনে নেন সোহেল রানা।

এর পরের গল্পগুলো রামিসার স্যান্ডেলের কালো রঙের মতো। যে গল্প চোখ বন্ধ করলে দম আটকে দেয়। পৃথিবীকে দুর্জন মনে হয়। যে গল্প ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশজুড়ে। কাঁদছে, কাঁদাচ্ছে কোটি হৃদয়।

বাড়ির নিচে কলাপসিবল গেট। ওপরে ঝুলছে একটি সাদা ব্যানার। ব্যানারে ফুটফুটে সুন্দর রামিসার মিষ্টি হাসির ছবি। যে হাসি ফুল হয়ে ফুটছে। ব্যানারে লেখা ‘রামিসা হত্যার বিচার চাই। হত্যাকারীর জনসম্মুখে ফাঁসি চাই।’

রামিসা পড়তো পপুলার মডেল হাসি স্কুলে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে। রোল নম্বর ছিল ১। মেধাবী এ শিশু শিক্ষার্থীর পৃথিবীর কোনো স্বার্থ কিংবা দ্বন্দ্বে ছিল না কোনো ভূমিকা। অথচ তার সঙ্গেই ঘটেছে এক পাশবিক নৃশংসতা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে গিয়ে দেখা যায় কালো স্যান্ডেল জোড়ার একটি বাঁকা হয়ে রামিসাদের দরকার দিকে মুখ করা। অপর পাশের ফ্ল্যাটের কোনো নম্বর নেই। যেখানে ছিল ঘাতকের বাস। যেখানে একটি তাজা ফুল ঝরে গেছে অকালে। দরজা নক করা হলে মিনিট পাঁচেক পর খুলে দেন রামিসার চাচা মো. সালাহ উদ্দিন। কথা হলো বাইরে দাঁড়িয়ে। ভিতরে ঢোকানোর মতো অবস্থায় তারা নেই।

রামিসারামিসাদের ফ্ল্যাটের সামনে কালো জুতা, অপর পাশের ফ্ল্যাটেই তার ওপর চলে পাশবিক নির্যাতন

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার এলেন। প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা-বাবা। বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবারজুড়ে। ভারী হয়ে উঠেছে পল্লবীর ছোট্ট এ বাসাটি।

ছোট্ট রামিসার প্রতিদিনের চাহিদা ছিল ১০ টাকা। টিফিন বা তার প্রিয় খাবার খেতো সে। মেয়ের সেই গল্প বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। এরপর আর কোনো কথা বলতে পারেননি রামিসার বাবা। শুধু চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

রামিসার মা পারভীন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। প্রতিদিন অনেক টাকার ওষুধ খেতে হয়। রামিসা বলতো ও বড় হয়ে ডাক্তার হবে। আমার চিকিৎসা করবে। কিন্তু ডাক্তার আর হইতে পারলো না আমার মেয়ে।

বিচার ব্যবস্থার ওপর আক্ষেপ প্রকাশ করে রামিসার মা ও বাবা বলেন, বিচার চাইয়া এখন কি হবে? আমাদের কলিজার টুকরা চলে গেছে বিচার দিয়া কি এহন?

রামিসারামিসার চাচা

রামিসার চাচা মো. সালাহ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, রামিসার বাবা-মা ঘণ্টায় ঘণ্টায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। দুদিন ধরে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে, তাও কান্না থামছে না। দাফন শেষ করে কবরের পাশ থেকে রামিসার বাবাকে টেনে তুলতে আনতে পারি না। খাওয়া-দাওয়ায় করতে চাচ্ছে না। শুধু পানি মুখে তুলে দিচ্ছি কষ্ট করে।

শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। যেহেতু আসামি নিজে জবানবন্দি দিয়েছেন, এর পরে তো আর কোনো সাক্ষী-তদন্তের দরকার নেই।

বেশি কথা তার বাবা-মায়ের পক্ষে বলা সম্ভব ছিল না। রামিসার মা বলছিলেন, মেয়ে রুম থেকে বের হওয়ার পর হ্যাঁচকা টানে হয়তো ঘাতক তাকে টেনে নিয়ে যায়। যাতে শেষ হয়ে যায় তার সব। পাশের ফ্ল্যাট থেকে মেয়ের চিৎকার শুনেও বোঝেননি তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।

রামিসার বাসার সামনেও তখন চলছিল বিক্ষোভ। এলাকাবাসী সোনিয়া আক্তার নিপু জাগো নিউজকে বলেন, আমার তিন ছেলেমেয়ে। থাকি পল্লবীতেই। এখন আমাদের নিরাপত্তা নেই। বাচ্চা রেখে যে ওয়াশরুমে যাবো সেই নিরাপত্তাও নেই। স্বামীকে বিশ্বাস নেই, বাবাকেও বিশ্বাস নেই। আমার বাচ্চাদের স্কুলেই পাঠাবো না। মানুষের প্রতি বিশ্বাস উঠে গেছে। ঘরেও নিরাপত্তা নেই বাইরেও নিরাপত্তা নেই।’

রামিসা

চার বছরের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে ফাঁসির রায়ের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রিয়া মনি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, রামিসার ঘটনার ছবি দেইখা আমার স্বামী আমাকে বলেছে ঘরের বাইরে যেন আমি কাজে না যাই। সব সময় বাসায় বাচ্চার সঙ্গে থাকি। কতটা ভয় নিয়ে আমার স্বামী একথা বলতে পারে। সেখানে রামিসার বাবা বলেছে- সে বিচার চায় না।

তিনি বলেন, আমার বাচ্চাকে কার কাছে দিয়ে যাবো তার কোনো গ্যারান্টি আছে? বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার আমি দেখি নাই। পুলিশ ধরছে এরপর ছয় মাস, এক বছর জেল খাটছে এরপর আবার বাইর হয়ে গেছে। বাইরে আইসা আবার অপরাধ করতেছে। রামিসার সঙ্গে যে খারাপ কাজ করেছে তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফাঁসি চাই।

আরও পড়ুন

শিশু রামিসার বাসায় গেলেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন দ্রুত বিচারের আশ্বাস
চিৎকার শুনেছিলাম, সেটা যে আমার মেয়ে বুঝতে পারিনি: রামিসার মা
বড় বোনের পিছে পিছে বের হওয়াই কাল হলো রামিসার

রামিসার বাসার সামনে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ঋসা জাগো নিউজকে বলেন, আমি বাসা থেকে বের হলে আমার বাবা-মা টেনশন করে। তারা আমাকে বলেছে ব্যাগে ছুরি-কাচি নিতে নিজের সেফটির জন্য। বছরের পর বছর এমন নারী-শিশু ধর্ষণের ঘটনা দেখেই আসছি। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হয় না। আমরা ভোট দেই আমাদের নিরাপত্তার জন্য, কিন্তু কোনো সরকারই নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে না, পরিবর্তন নেই।

আইনমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে এই শিক্ষার্থী বলেন, আসামি স্বীকার করেছে, সেখানে সাতদিনের আবার কীসের ইনভেস্টিগেশন। সঙ্গে সঙ্গে জনসম্মুখে এনে আসামিকে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হতো তাহলে রামিসাকে এভাবে চলে যেতে হতো না। রামিসার বাবা-মাকে এভাবে কষ্ট পেতে হতো না।

বৃহস্পতিবার রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পপুলার মডেল স্কুলে যান। সেখানে গিয়ে রামিসার সহপাঠীদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদেন। তার সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ে রামিসার সহপাঠীরাও। একে অপরকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কান্না যেন কারোরই থামছিল না।

কান্না করতে করতে রামিসার সহপাঠীরা বলে, রামিসাকে কখনোই ভোলা যাবে না। এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। খুনি যেন কোনোভাবেই পার না পায়।

রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। এমন নৃশংসতার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। পল্লবী ও মিরপুরে আলাদাভাবে বিক্ষোভ করে সহপাঠী ওএলাকাবাসী।

রামিসা

বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করে অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এসময় থানা পুলিশ এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানায়।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, শিশুটি হত্যার পর মরদেহ গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যদিও ফ্ল্যাটের ভেতর থেকেই দেহের অংশ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে সিআইডিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলেন পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬)।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল ও তার সহযোগী স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে এ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

যে যত কথাই বলুক বিচারহীনতা এ দেশের সংস্কৃতি। অনেক আলোচিত, হৃদয়স্পর্শী ঘটনা কখনো আলোর মুখ দেখেনি। মৃত্যুর দুদিন পর দরজার সামনে পড়ে থাকা এক পাটি ছোট্ট কালো স্যান্ডেল জড় পদার্থ হয়েও হয়তো অনেক কিছু বলে দেয়।

টিটি/এএসএ