মো. শাকিলুর জামান শাকিল ও প্রফেসর ড. মো. গোলাম মোস্তফা
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ২২ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ১৯৭০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষার মাধ্যমে পৃথিবী নামক এই গ্রহটিকে বাসযোগ্য রাখাই দিবসটির মূল লক্ষ্য। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী শুধু একটি গ্রহ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানে এই বাস্তবতা আরও কঠিনভাবে ধরা দিচ্ছে যে, আমাদের এই প্রিয় ধরিত্রী এখন বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পতিত। উন্নয়ন, ভোগবাদ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে পরিবেশের ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে, আর তার ফল আমরা প্রতিদিনই অনুভব করছি। উল্লেখযোগ্য ৭ টি পরিবেশগত সংকট হলো-
- ১. জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, যা ক্রমাগত বিপজ্জনক সীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, যদি এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়, তবে তা বৈশ্বিক বাস্তুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৩৮ বিলিয়ন টন ছাড়িয়েছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। বাংলাদেশে এর প্রভাব স্পষ্ট, যেমন- ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বৃদ্ধি, যা এরই মধ্যে মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে।
- ২. পরিবেশ দূষণ বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ সংকট, যা মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বর্জ্য পানি সরাসরি নদী ও জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটির বেশি মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে । এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বায়ু দূষণের কারণে অকালমৃত্যুর শিকার হয়। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর অনেকগুলোই দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত, যেখানে পি.এম-২.৫ এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার কয়েকগুণ বেশি। পরিবেশে ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর দূষক পদার্থ আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের মাটিতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান সিসার মাত্রা ৭০ হাজার পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে; যা নির্ধারিত মানদণ্ডের তুলনায় প্রায় ৩৫০ গুণ বেশি। এছাড়া ঢাকায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতি শনাক্ত করেছে আইসিডিডিআর,বি। বায়ু, পানি ও মাটির ক্রমবর্ধমান দূষণ মানবজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং বিভিন্ন রোগব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
- ৩. জীববৈচিত্র্যের হ্রাসও একটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। গত পাঁচ দশকে পৃথিবীর বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ কমে গেছে। বন উজাড়, অবৈধ শিকার, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, যা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, সেটিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, দূষণ এবং দখলের কারণে এই ম্যানগ্রোভ বন তার স্বাভাবিক গঠন হারাতে বসেছে।
- ৪. পানি সংকটও ধীরে ধীরে একটি বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ২.৫ শতাংশ মিঠা পানি, যার একটি বড় অংশ বরফে আবদ্ধ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং দূষণের কারণে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং আর্সেনিক দূষণ এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
- ৫. আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্লাস্টিক দূষণ, যা এখন বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে গড়ে একজন মানুষ বছরে প্রায় ২৮ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি করে। এভাবে প্রতি বছর ৮-১২ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে প্রবেশ করছে, যার বড় অংশ নদীপথে বহন হয়ে আসে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম প্রধান মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবহন পথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের শরীরেও পৌঁছে যাচ্ছে। এছাড়া একটি গবেষণা বলছে, একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৮ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণিকা বায়ুর মাধ্যমে শরীরে গ্রহণ করে যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
- ৬. বন উজাড় আজকের পৃথিবীর অন্যতম গুরুতর একটি পরিবেশগত সংকট। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে, ফলে অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ) এর তথ্য অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৬৮ শতাংশ কমে গেছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
- ৭. কৃষিজমির অবক্ষয় আরেকটি গুরুতর পরিবেশগত সংকট, যা খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবন-জীবিকার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। অপরিকল্পিত বাসস্থান নির্মাণ, শিল্পায়ন, শিল্পবর্জ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, লবনাক্ততা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিমাত্রায় ব্যবহার এবং অনিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থাপনার কারণে মাটি দ্রুত তার উর্বরতা হারাচ্ছে। এছাড়াও বর্তমানে উর্বর জমির টপ সয়েল কেটে ইট ভাটায় ব্যবহার করা বাংলাদেশে খুব সাধারণ বিষয় হিসেবে গণ্য। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩৩ শতাংশ মাটি এরই মধ্যে অবক্ষয়ের শিকার এবং প্রতিবছর প্রায় ২৪ বিলিয়ন টন উর্বর মাটি ক্ষয় হচ্ছে।
বর্তমান পৃথিবী এরূপ বহুমাত্রিক পরিবেশগত সংকটে আক্রান্ত, যা আমাদের জীবন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ, জীববৈচিত্র্যের হ্রাস, ভূমির অবক্ষয়, বনাঞ্চল উজাড়, পানি সংকট এবং বায়ু, পানি ও মাটির দূষণ-এসব চ্যালেঞ্জ আমাদের অস্তিত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবী শুধু একটি গ্রহ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। সুতরাং এই অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাসযোগ্য, প্রাণ-প্রকৃতিতে স্পন্দিত, দূষণমুক্ত একটি সবুজ সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা আমাদের অবশ্য কর্তব্য।
লেখক:
মো. শাকিলুর জামান শাকিল
সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা প্রেষণ, মাউশি, ঢাকা ও পিএইচডি গবেষক, পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রফেসর ড. মো. গোলাম মোস্তফা
পরিচালক, পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- আরও পড়ুন
শনির বলয় থেকে বৃহস্পতির ঝড়, সৌরজগতের বিস্ময়কর রহস্য
ওয়ান হেলথ: মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য সংহতি
কেএসকে
এডমিন 









