ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ বা পর্যাপ্ততা (ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি) রাখার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। দেশের ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণের চাপের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখার সুপারিশ রয়েছে, সেখানে ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংক খাতের এ হার নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫-এ উঠে এসেছে এ তথ্য।
দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে পাকিস্তান
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান দেশগুলোর মধ্যে মূলধন সংরক্ষণে শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে শ্রীলঙ্কা এবং তৃতীয় অবস্থানে ভারত। তালিকার সর্বনিম্ন স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
২০২৫ সালে পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ ও ভারতের ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এ হার মাত্র ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত কম।
দেশে ধারাবাহিকভাবে কমছে হার
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের মূলধন পর্যাপ্ততা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ২০২২ সালে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও ২০২১ সালে ১১ দশমিক ৮ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতায় বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিগত দেড় দশকে ঋণের নামে বিপুল অর্থ বিতরণ হলেও তার বড় অংশ আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি। অনেক ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, আবার রাজনৈতিক প্রভাবেও অযোগ্য ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণেই সংকট তৈরি
মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত বা ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও (সিএআর) একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কোনো ব্যাংকের মূলধন কমে গেলে ঝুঁকি বহনের সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং নতুন বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মূলত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণে সংকট তৈরি হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ে, ফলে মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
তিনি জানান, বর্তমানে খেলাপি ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং যাচাই-বাছাই করে নতুন ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে নতুন করে ঋণ খেলাপিতে পরিণত না হয়। তার আশা, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
ঋণ বিতরণে দরকার কঠোর নজরদারি
এ নিয়ে কথা হলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও ব্যাংক খাত গবেষক এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়েছে। তার মতে, অর্থনীতিকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হতে দিতে হবে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ বিতরণে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে মূলধন সংকট ও খেলাপি ঋণের সমস্যা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর বড় অংশের ঋণ খেলাপিদের কাছে আটকে থাকায় আয় কমে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ বা পুনঃঅর্থায়নে সক্ষমতা হারাচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিমূলক ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ইএআর/একিউএফ
এডমিন 














