১২:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক মন্ত্রীর বাড়ি এখন বখাটেদের আড্ডাখানা

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ১২:০৪:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
  • 1

জামালপুর শহরের একাধিক বহুল পরিচিত রাজনৈতিক স্থাপনা ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসভবন আজ পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।

সময়ের পালাবদলে একসময় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এসব ভবন এখন মাদকসেবী, বখাটে ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

একসময় যেখানে দিনের শুরু হতো রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততা আর নেতা-কর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকত চারপাশ। সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা।

শহরের বকুলতলা এলাকায় অবস্থিত সাবেক মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের বিলাসবহুল বাসভবন, তার মালিকানাধীন আলেয়া গার্ডেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।

একসময় কড়া নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরব থাকা এসব স্থাপনার দেয়ালজুড়ে এখন ভাঙচুরের চিহ্ন, আগাছায় ঢেকে যাওয়া আঙিনা এবং পরিত্যক্ত পরিবেশ। ভবনের বিভিন্ন অংশে পড়ে আছে ব্যবহৃত মাদকের সরঞ্জাম, সিগারেটের খালি প্যাকেট ও অন্যান্য আলামত।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে মালিকপক্ষের কেউ সেখানে ফিরে না আসায় ভবনগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। আর সেই সুযোগেই ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে ওঠে মাদকসেবী ও বখাটেদের আস্তানা।

দিনের বেলায় এসব ভবন অনেকটা নিস্তব্ধ থাকলেও সন্ধ্যার পর চিত্র বদলে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জড়ো হয় বিভিন্ন বয়সি তরুণ। অনেকেই সেখানে মাদক সেবন করে এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

বকুলতলা এলাকার পাশের একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি বলেন, ‘একসময় বিশাল বহুল আ.লীগ নেতার বাড়ি জাঁকজমকপূর্ণ থাকত। এলাকায় অনেক মানুষ আসা-যাওয়া করত। কিন্তু ৫ আগস্টের পর এটি বখাটেদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। আমাদের স্কুলের একদম পাশে হওয়ায় অনেক সময় ক্লাস চলাকালে ছেলেরা এসে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।’

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরাও।

রিকশাচালক জালাল বলেন, ‘আগে তো এটা মন্ত্রীর বাড়ি ছিল। এলাকায় একটা আলাদা গুরুত্ব ছিল। এখন সন্ধ্যার পর মাদকাসক্ত ও অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময়ও ভয় লাগে। কে কখন কী করে বসে বলা যায় না।’

স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিত্যক্ত এসব স্থাপনায় প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত লোকজনের আনাগোনা থাকে। অনেক সময় উচ্চস্বরে গান বাজানো, চিৎকার-চেঁচামেচি ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু নজরদারির অভাবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান আন্দোলনের জামালপুরের সামনের সারির কর্মী এহসান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যে সব ফ্যাসিস্ট নেতারা দেশ ছেড়েছেন বা আত্মগোপনে রয়েছেন, তাদের অনেক বিলাসবহুল সম্পদ এখন নেশার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সেখানে তরুণদের পাশাপাশি নারীদের প্রলোভনে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বিষয় নয়, সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়ও।’

সাবেক মন্ত্রীর বাড়ি এখন বখাটেদের আড্ডাখানা

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব স্থাপনা নিয়ে প্রশাসন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে এসব জায়গা এখন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।’

সচেতন নাগরিকদের মতে, পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা বড় বড় স্থাপনা শুধু মাদকসেবীদেরই আকৃষ্ট করছে না, বরং সেখানে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি এসব ভবনের অবস্থান স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে পরিত্যক্ত ভবনগুলোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তও প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

এসব এলাকা থেকে মাদক সেবিদের উৎপাত নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইয়াহিয়া আল মামুন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শহরের দুইটি স্থানে মাদকসেবীদের আনাগোনার বিষয়ে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পেয়েছেন। সন্ধ্যার পর থেকে ওইসব এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হৃদয় আহম্মেদ/এএইচ/এএসএম

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

সাংবাদিকদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, ডা. শাফীকে নিয়ে ক্ষুব্ধ মন্ত্রী

সাবেক মন্ত্রীর বাড়ি এখন বখাটেদের আড্ডাখানা

আপডেট সময়ঃ ১২:০৪:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

জামালপুর শহরের একাধিক বহুল পরিচিত রাজনৈতিক স্থাপনা ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসভবন আজ পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।

সময়ের পালাবদলে একসময় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এসব ভবন এখন মাদকসেবী, বখাটে ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

একসময় যেখানে দিনের শুরু হতো রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততা আর নেতা-কর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকত চারপাশ। সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা।

শহরের বকুলতলা এলাকায় অবস্থিত সাবেক মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের বিলাসবহুল বাসভবন, তার মালিকানাধীন আলেয়া গার্ডেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।

একসময় কড়া নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরব থাকা এসব স্থাপনার দেয়ালজুড়ে এখন ভাঙচুরের চিহ্ন, আগাছায় ঢেকে যাওয়া আঙিনা এবং পরিত্যক্ত পরিবেশ। ভবনের বিভিন্ন অংশে পড়ে আছে ব্যবহৃত মাদকের সরঞ্জাম, সিগারেটের খালি প্যাকেট ও অন্যান্য আলামত।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে মালিকপক্ষের কেউ সেখানে ফিরে না আসায় ভবনগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। আর সেই সুযোগেই ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে ওঠে মাদকসেবী ও বখাটেদের আস্তানা।

দিনের বেলায় এসব ভবন অনেকটা নিস্তব্ধ থাকলেও সন্ধ্যার পর চিত্র বদলে যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জড়ো হয় বিভিন্ন বয়সি তরুণ। অনেকেই সেখানে মাদক সেবন করে এবং অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

বকুলতলা এলাকার পাশের একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি বলেন, ‘একসময় বিশাল বহুল আ.লীগ নেতার বাড়ি জাঁকজমকপূর্ণ থাকত। এলাকায় অনেক মানুষ আসা-যাওয়া করত। কিন্তু ৫ আগস্টের পর এটি বখাটেদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। আমাদের স্কুলের একদম পাশে হওয়ায় অনেক সময় ক্লাস চলাকালে ছেলেরা এসে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।’

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরাও।

রিকশাচালক জালাল বলেন, ‘আগে তো এটা মন্ত্রীর বাড়ি ছিল। এলাকায় একটা আলাদা গুরুত্ব ছিল। এখন সন্ধ্যার পর মাদকাসক্ত ও অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময়ও ভয় লাগে। কে কখন কী করে বসে বলা যায় না।’

স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিত্যক্ত এসব স্থাপনায় প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত লোকজনের আনাগোনা থাকে। অনেক সময় উচ্চস্বরে গান বাজানো, চিৎকার-চেঁচামেচি ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু নজরদারির অভাবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান আন্দোলনের জামালপুরের সামনের সারির কর্মী এহসান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যে সব ফ্যাসিস্ট নেতারা দেশ ছেড়েছেন বা আত্মগোপনে রয়েছেন, তাদের অনেক বিলাসবহুল সম্পদ এখন নেশার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সেখানে তরুণদের পাশাপাশি নারীদের প্রলোভনে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বিষয় নয়, সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়ও।’

সাবেক মন্ত্রীর বাড়ি এখন বখাটেদের আড্ডাখানা

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব স্থাপনা নিয়ে প্রশাসন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে এসব জায়গা এখন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।’

সচেতন নাগরিকদের মতে, পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা বড় বড় স্থাপনা শুধু মাদকসেবীদেরই আকৃষ্ট করছে না, বরং সেখানে চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং কার্যক্রমসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার কাছাকাছি এসব ভবনের অবস্থান স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে পরিত্যক্ত ভবনগুলোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তও প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

এসব এলাকা থেকে মাদক সেবিদের উৎপাত নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইয়াহিয়া আল মামুন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শহরের দুইটি স্থানে মাদকসেবীদের আনাগোনার বিষয়ে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য পেয়েছেন। সন্ধ্যার পর থেকে ওইসব এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

হৃদয় আহম্মেদ/এএইচ/এএসএম