• বাঁধের মান নিয়ে প্রশ্ন
• পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই
• পিআইসিতে নেই প্রকৃত কৃষকরা
‘এই বছর কষ্ট করে ধান করেও লাভ হলো না। জলাবদ্ধতায় সব ধান তলিয়ে গেছে। এখন সারা বছর কষ্ট করে পার করতে হবে। চিন্তায় আছি—সারাটা বছর চলবো কীভাবে?’
এভাবেই নিজের হতাশার কথা বলছিলেন হাওরের কৃষক ছাত্তার মিয়া। তবে শুধু ছাত্তার মিয়া না, তার মতো এমন আক্ষেপ হাওরের শত শত কৃষকের। তারা বলছেন, প্রতিবছর অনেক কষ্টে করে ধান চাষাবাদ করলেও ঘরে তুলতে পারেন না। তার আগেই জলাবদ্ধতায় ডুবে যায় সোনালি ধান। এজন্য অপরিকল্পিত বাঁধকে দায়ী করেছেন কৃষকরা।
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে বোরো ধান ঘরে তুলতে পারলে হাসি ফোটে কৃষকের মুখে। তবে সেই ধান রোপণ থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত চরম দুশ্চিন্তায় সময় পার করতে হয় এই অঞ্চলের কৃষকদের। তার কারণ উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। যখন ঢল নামে তখন ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় কৃষকের স্বপ্নের ধান।

তবে এবছর পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভাঙেনি। এবার কৃষকের স্বপ্নের ধান ডুবেছে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায়। অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে পারেনি বাঁধ। ফলে বাঁধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষকরা।
হাওরের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালে দুর্নীতি, অনিয়ম ও মানহীন কাজের জন্য যখন হাওরের বাঁধ ভেঙে জেলার শতভাগ ফসল তলিয়ে যায়, তখন সরকার ঠিকাদারি প্রথা বাঁধ দিয়ে হাওরে যাদের জমি আছে তাদের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ হবে—এমন নীতিমালা প্রণয়ন করে। এ কাজের তদারকির জন্য প্রধান হিসেবে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে কৃষকদের সম্পৃক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

চলতি বছর জেলার দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো ধান রক্ষায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ করা হয়েছে। এবার এসব বাঁধের কোথাও ভাঙেনি। তবে অতিবৃষ্টিতে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় এক লাখ ২৩ হাজার কৃষকের ধান তলিয়ে গেছে।
‘শুধু বাঁধ দিয়ে যে আর ফসল রক্ষা পাবে না, এবার এটা বোঝা গেছে। বাঁধ লাগবে, সঙ্গে বিকল্প ভাবতে হবে। উজানের পানি ভাটিতে নির্বিঘ্নে নামার পথে যেসব বাধা আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। হাওর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় হাওরে কৃষকের কান্না থামবে না’
ইসলামপুর গ্রামের কৃষক কালারাজা বলেন, ‘ধান রক্ষায় সরকার বাঁধ নির্মাণ করে কিন্তু সেই বাধঁ কৃষকদের কাজে আসছে না। কারণ বাঁধ নির্মাণ করা হয় অপরিকল্পিতভাবে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে না। তাই এবার পাহাড়ি ঢল আসার প্রয়োজন হয়নি, বৃষ্টির পানিতেই সব ধান তলিয়ে গেছে।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে মাটিয়ান হাওরের কৃষক সুমন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবছর প্রকৃত কৃষকদের মাধ্যমে বাঁধের কাজের পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন করা হয়নি। হয়েছে সুবিধা ভোগীদের নিয়ে। সরকারের টাকা তারা বাঁধ নির্মাণের নামে লুটে নিচ্ছে। বাঁধ কৃষকদের কাজে আসছে না।’
‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন বলেন, ‘শুধু বাঁধ দিয়ে যে আর ফসল রক্ষা পাবে না, এবার এটা বোঝা গেছে। বাঁধ লাগবে, সঙ্গে বিকল্প ভাবতে হবে। উজানের পানি ভাটিতে নির্বিঘ্নে নামার পথে যেসব বাধা আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। হাওর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় হাওরে কৃষকের কান্না থামবে না।’
‘এবছর প্রকৃত কৃষকদের মাধ্যমে বাঁধের কাজের পিআইসি গঠন করা হয়নি। হয়েছে সুবিধা ভোগীদের নিয়ে। সরকারের টাকা তারা বাঁধ নির্মাণের নামে লুটে নিচ্ছে। বাঁধ কৃষকদের কাজে আসছে না’
তিনি জানান, ২০১৮ সাল থেকে জেলার হাওরে ফসল রক্ষায় সাত হাজার ৭৭টি প্রকল্পে পাঁচ হাজার ৮৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। তবে এসব বাঁধের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, ‘হাওরে যখন বাঁধ নির্মাণ করা হয় তখন পানি নিষ্কাশনের বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়। তবে এবছর খাল, নদী ভরাট ও অনেকেই খাল দখলসহ রাস্তা, স্থাপনা করায় হাওরের পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হয়েছে। যে কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।’
‘হাওরে যখন বাঁধ নির্মাণ করা হয় তখন পানি নিষ্কাশনের বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়। তবে এবছর খাল, নদী ভরাট ও অনেকেই খাল দখলসহ রাস্তা, স্থাপনা করায় হাওরের পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হয়েছে। যে কারণে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে’
সম্প্রতি সুনামগঞ্জে বাঁধ পরিদর্শনে এসে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাইছার আলম বলেন, হাওরের ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
এসআর/এমএস
এডমিন 














