এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা প্রতিবছর ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার পথে হাঁটছে সরকার। তবে হুট করে পরীক্ষা এগিয়ে আনার এমন সিদ্ধান্তের বিপক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তাদের প্রস্তাব- ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারিতে নেওয়া হোক। ধীরে ধীরে পরীক্ষা এগিয়ে ডিসেম্বরে নেওয়া যেতে পারে।
শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারি মাসজুড়ে নির্ধারণ করতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বহাল রাখা হচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীর ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণাও! অর্থাৎ, ৩১ ডিসেম্বর শুরু হতে পারে এসএসসি পরীক্ষা। এরপর জানুয়ারি মাসজুড়ে ৩৮ দিনের রুটিনে রোজার ছুটির আগেই তা শেষ করা হবে।
বুধবার (১৩ মে) দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সেখানে সব পক্ষের মতামত শোনেন তিনি। নানান দিক বিশ্লেষণ করে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরুর প্রাথমিক একটি তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বিষয়টি এখনো প্রকাশ করেনি মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ড।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্তত তিনজন কর্মকর্তা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তারা জানান, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হতে পারে ৩১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার। ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এ পরীক্ষা শেষ করা হবে।
শিক্ষার্থীদের চাওয়ায় গুরুত্ব, বহাল মন্ত্রীর ঘোষণাও
গত ২৫ এপ্রিল এক সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দেন, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা এ বছরের ডিসেম্বরে নেওয়া হবে। এরপর থেকেই মূলত শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। শিক্ষাবিদরাও হুট করে এত বেশি সময় পরীক্ষা এগিয়ে আনার সমালোচনা করেন।
বিষয়টি সমাধানে মূলত বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকে আলোচনা শেষে প্রাথমিকভাবে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে মন্ত্রীর ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণাও বহাল থাকছে। আবার শিক্ষার্থীসহ অংশীজনদের মতামতও গুরুত্ব পাচ্ছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ৮-৯ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজার ছুটি শুরু হতে পারে। তার আগেই এসএসসি পরীক্ষা শেষ করা যায় কি না, তা শিক্ষামন্ত্রী বিবেচনা করতে বলেছেন। তিনি ৩১ ডিসেম্বর পরীক্ষা শুরু ধরে এবং ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া সময়সূচি তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন। সেটি তৈরির পর আবার পর্যালোচনা করা হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এটি বারবার বলে আসছেন। এ কারণে ডিসেম্বরেই পরীক্ষা শুরুর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর পরীক্ষা শুরু হবে। আর শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা যেহেতু হুট করে পরীক্ষা এগোনোর বিপক্ষে এবং তারা জানুয়ারিতে পরীক্ষা নিতে প্রস্তাব দিয়েছেন। সেদিক বিবেচনা করে ডিসেম্বরের শেষ দিনে পরীক্ষা শুরু করে পুরো জানুয়ারিতে রুটিন সাজানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে মন্ত্রীর কথা থাকছে, শিক্ষার্থীদের চাওয়াও পূরণ হচ্ছে।’
এসএসসির রুটিন যেমন হতে পারে
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাধারণত ৪০ দিনে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে রুটিন তৈরি করতে বলেছেন। প্রাথমিক পরিকল্পনায় ৩১ ডিসেম্বর পরীক্ষা শুরু হবে। ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত লিখিত বা তত্ত্বীয় পরীক্ষা নেওয়া হবে। ১ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ করতে হবে।’
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী বলেন, ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রোজা শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি জানুয়ারির শুরুতেই এসএসসি পরীক্ষা শুরু করা যায়, তাহলে আমরা রোজার আগে শেষ করতে পারবো।
আরও পড়ুন
ডিসেম্বরে পরীক্ষায় বসতে নারাজ শিক্ষার্থীরা, জানুয়ারি-এপ্রিলের প্রস্তাব
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা চলতি বছরের ডিসেম্বরে: শিক্ষামন্ত্রী
রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক তামান্না বেগম বলেন, আমরা যদি এসএসসি পরীক্ষা আগে শুরু করি, তাহলে এইচএসসির সিলেবাস কমপ্লিট করতে পারবো। তবে এইচএসসি পরীক্ষাটা মার্চ-এপ্রিলে নিলে ভালো হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাবিনা ইয়াসমিন জাগো নিউজকে বলেন, সভায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা প্রতি বছর কোন সময়ে নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে অংশীজনদের বক্তব্য শোনা হয়েছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষার্থী-শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করছি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কবে নিতে পারি এবং কীভাবে সময় অ্যাডজাস্ট করতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কতদিনের মধ্যে আমাদের টার্গেট ফুলফিল করবো, ২০২৭ সালে ডিসেম্বরে পরীক্ষা নেবো নাকি ২০২৮ সালে অ্যাডজাস্ট করবো, তা নিয়েও মতামত পেয়েছি। আমাদের সিদ্ধান্তে যেন শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটাকে প্রাধান্য দিয়ে রুটিন করা হবে।
জানা যায়, বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিকপর্যায়ে যে বছর দশম শ্রেণির ক্লাস শেষ করে, তার পরের বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। এইচএসসির ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির শুরুতে এবং এইচএসসি পরীক্ষা এপ্রিলের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। করোনা পরিস্থিতির পর থেকে এ সূচি আর বজায় রাখা যাচ্ছে না, বরং আরও পিছিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ২১ এপ্রিল। আর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে জুলাই মাসে।
আরও পড়ুন
কোনো ফাইল ৭২ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখা যাবে না: শিক্ষামন্ত্রী
একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন মা-ছেলে
কীভাবে সব পাবলিক পরীক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষা শেষ মাস ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা যায়, তা নির্ধারণে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছে মন্ত্রী ও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকের পর প্রাথমিকভাবে এ রুটিন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে এ দুটি পরীক্ষায় বিষয় কমানোর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে বিশেষ কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী বছরের এ পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো সারা দেশে একই প্রশ্নপত্রে (অভিন্ন প্রশ্নপত্র) পরীক্ষা নেওয়া হবে।

এদিকে, প্রস্তাবিত রুটিনের বিশেষ নির্দেশাবলিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৭ দিন আগে পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান দায়ী থাকবেন।
পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবেন। কেন্দ্রসচিব ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, পরীক্ষার্থী পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন আনতে এবং ব্যবহার করতে পারবেন না।
সৃজনশীল, রচনামূলক (তত্ত্বীয়), বহুনির্বাচনি ও ব্যাবহারিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর উপস্থিতির জন্য একই উপস্থিতিপত্র ব্যবহার করতে হবে। ব্যবহারিক পরীক্ষা স্ব স্ব কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে। এ বিষয়ে পত্রিকা এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া, তারিখ ও সময় জানিয়ে দেওয়া হবে।
এএএইচ/এমআরএম
এডমিন 














