১২:২১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় যারা

  • এডমিন
  • আপডেট সময়ঃ ১২:০৩:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
  • 1

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অবশেষে সেই বহুল আলোচিত ঘটনাটিই ঘটেছে। দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা, দলের ভেতরের চাপ এবং দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

তার পদত্যাগের ফলে লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং যুক্তরাজ্যের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ খুলে গেছে। এখন ডাউনিং স্ট্রিটের পরবর্তী বাসিন্দা হিসেবে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম, যাকে অনেকেই কার্যত পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ধরে নিচ্ছেন।

স্টারমারের এই বিদায় অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার সরকারের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নির্বাচনী প্রচারে উপেক্ষিত অর্থনৈতিক সংকটগুলো সামনে আসার পর বাজেট ঘাটতি কমাতে কর বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয় সরকারকে। এতে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দ্রুত বাড়তে থাকে।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে বিতর্কিত সম্পর্ক থাকা পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রভাব পড়ে মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে, যেখানে লেবার পার্টি বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এরপর সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংসহ প্রায় শতাধিক এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

তার পদত্যাগের পর লেবার পার্টিতে নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। বিভিন্ন প্রেডিকশন মার্কেট ও বেটিং অডস অনুযায়ী, অ্যান্ডি বার্নহামের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। “কিং অব দ্য নর্থ” হিসেবে পরিচিত বার্নহাম সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সক্ষমতার শক্ত প্রমাণ দিয়েছেন।

গত ১৮ জুন মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে তিনি বড় ব্যবধানে জয় পান। যদিও আগের স্থানীয় নির্বাচনে এই আসনে ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘রিফর্ম ইউকে’ শক্ত অবস্থানে ছিল, তবু উপনির্বাচনে বার্নহাম ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে সহজেই জয় নিশ্চিত করেন। এই জয় তাকে পার্লামেন্টে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং নেতৃত্বের দৌড়ে প্রয়োজনীয় আইনি যোগ্যতাও এনে দেয়।

নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতায় বার্নহামের পাশাপাশি ওয়েস স্ট্রিটিং কিংবা সাবেক সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নসের মতো নেতারাও অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্রিটিংয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। নিয়ম অনুযায়ী, লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসতে হলে অন্তত ৮১ জন এমপির মনোনয়ন পেতে হবে, যা ৪০৩ জন লেবার এমপির মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন হিসেবে ধরা হয়।

এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দলের সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভোটে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাধারণ সদস্যদের মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহামের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি এবং তিনি এই প্রতিযোগিতায় সহজ জয় পেতে পারেন।

তবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে পেলেও অ্যান্ডি বার্নহামের সামনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। ইউগভের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মে থেকে জুনের মধ্যে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের কাছে বার্নহামের প্রতি অনীহার হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তার জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। 

একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরে স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাঙ্গা করার কঠিন কাজ তার কাঁধে পড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—বিশেষ করে একজন খামখেয়ালি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে ব্রিটেনের কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার মতো অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিও তাকে অত্যন্ত সাবধানে সামলাতে হবে। দেশ পরিচালনার এই নতুন অধ্যায়ে বার্নহাম কতটুকু সফল হবেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা যুক্তরাজ্য।

সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট।

ট্যাগঃ
জনপ্রিয় খবর

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় যারা

আপডেট সময়ঃ ১২:০৩:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অবশেষে সেই বহুল আলোচিত ঘটনাটিই ঘটেছে। দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা, দলের ভেতরের চাপ এবং দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।

তার পদত্যাগের ফলে লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং যুক্তরাজ্যের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ খুলে গেছে। এখন ডাউনিং স্ট্রিটের পরবর্তী বাসিন্দা হিসেবে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে আছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম, যাকে অনেকেই কার্যত পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ধরে নিচ্ছেন।

স্টারমারের এই বিদায় অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার সরকারের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নির্বাচনী প্রচারে উপেক্ষিত অর্থনৈতিক সংকটগুলো সামনে আসার পর বাজেট ঘাটতি কমাতে কর বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয় সরকারকে। এতে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দ্রুত বাড়তে থাকে।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে বিতর্কিত সম্পর্ক থাকা পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রভাব পড়ে মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে, যেখানে লেবার পার্টি বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এরপর সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংসহ প্রায় শতাধিক এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

তার পদত্যাগের পর লেবার পার্টিতে নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। বিভিন্ন প্রেডিকশন মার্কেট ও বেটিং অডস অনুযায়ী, অ্যান্ডি বার্নহামের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। “কিং অব দ্য নর্থ” হিসেবে পরিচিত বার্নহাম সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সক্ষমতার শক্ত প্রমাণ দিয়েছেন।

গত ১৮ জুন মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে তিনি বড় ব্যবধানে জয় পান। যদিও আগের স্থানীয় নির্বাচনে এই আসনে ডানপন্থী পপুলিস্ট দল ‘রিফর্ম ইউকে’ শক্ত অবস্থানে ছিল, তবু উপনির্বাচনে বার্নহাম ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে সহজেই জয় নিশ্চিত করেন। এই জয় তাকে পার্লামেন্টে প্রবেশের সুযোগ দেয় এবং নেতৃত্বের দৌড়ে প্রয়োজনীয় আইনি যোগ্যতাও এনে দেয়।

নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতায় বার্নহামের পাশাপাশি ওয়েস স্ট্রিটিং কিংবা সাবেক সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নসের মতো নেতারাও অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্রিটিংয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। নিয়ম অনুযায়ী, লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসতে হলে অন্তত ৮১ জন এমপির মনোনয়ন পেতে হবে, যা ৪০৩ জন লেবার এমপির মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন হিসেবে ধরা হয়।

এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দলের সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভোটে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাধারণ সদস্যদের মধ্যে অ্যান্ডি বার্নহামের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি এবং তিনি এই প্রতিযোগিতায় সহজ জয় পেতে পারেন।

তবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে পেলেও অ্যান্ডি বার্নহামের সামনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। ইউগভের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মে থেকে জুনের মধ্যে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের কাছে বার্নহামের প্রতি অনীহার হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তার জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। 

একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরে স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাঙ্গা করার কঠিন কাজ তার কাঁধে পড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—বিশেষ করে একজন খামখেয়ালি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে ব্রিটেনের কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার মতো অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিও তাকে অত্যন্ত সাবধানে সামলাতে হবে। দেশ পরিচালনার এই নতুন অধ্যায়ে বার্নহাম কতটুকু সফল হবেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা যুক্তরাজ্য।

সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট।