রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের সম্পর্কের বিরল একটি দৃষ্টান্ত নজর কাড়বে যে কারোরই। তেমনই একটি পোস্ট আজ চোখে পড়েছে অনেকেরই। সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া পোস্টটি এখন ঘুরছে অনেকের টাইমলাইনে। অধ্যাপক ডা. শিলা সেন এ বিষয়ে একটি পোস্ট করেছেন আজ বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে। শিলা সেনের লেখাটি জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
আজ ছবিতে যাঁকে আমার সঙ্গে দেখছেন, তিনি আমার ভাই—শরীফুল ইসলাম। রক্তের সম্পর্ক নয়, কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্কে তিনি আমার আপন ভাই, আর আমি তাঁর দিদি।
প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে আমাদের পরিচয়। তখন আমি থানার ঘাটের ছোট্ট একটি চেম্বারে চিকিৎসাজীবন শুরু করেছি। আশপাশের গ্রাম-শহর থেকে অল্প কিছু রোগী আসতেন। শরীফুল ভাই তখন তাঁর স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য আমার কাছে নিয়ে আসতেন। সেই থেকেই আমাদের পরিচয়।
এরপর একে একে তাঁদের পাঁচটি সন্তান—তিন মেয়ে ও দুই ছেলে—আমার হাতেই পৃথিবীর আলো দেখেছে। ভাবির যে কোনো অসুবিধায়ও তিনি নির্ভর করতেন আমার ওপর। ধীরে ধীরে রোগী-চিকিৎসকের সম্পর্ক পরিণত হলো ভাই-বোনের সম্পর্কে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানরা বড় হয়েছে। আমি তাঁদের পরিবারের একজন হয়ে গেছি। বাড়িতে যখনই কোনো মৌসুমি ফল ধরে, প্রথমেই আমার জন্য আলাদা করে পাঠানো হয়। এই ভালোবাসার মূল্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
আল্লাহর অশেষ রহমতে শরীফুল ভাইয়ের জীবনে অনেক উন্নতি হয়েছে। শম্ভুগঞ্জে তাঁর নিজস্ব বাড়ি রয়েছে। শম্ভুগঞ্জ বাজারে তিনি একটি পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন। নিজের উদ্যোগে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাশাপাশি তাঁর বড় ব্যবসা রয়েছে। কিন্তু এত সাফল্য, প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক স্বচ্ছলতার পরও তাঁর বিনয়, আন্তরিকতা, মানবিকতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা একটুও বদলায়নি। আজও তিনি আগের সেই সরল, আন্তরিক মানুষটিই আছেন।
তবে এই পরিবারের জীবনে একটি বড় কষ্টও ছিল। তাঁর বড় মেয়ের এপিলেপসি ছিল। বিয়ে হয় একটি অত্যন্ত ভালো ছেলের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের পর শুরু হয় আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। বহু প্রতীক্ষার পর গর্ভধারণ হলেও বারবার গর্ভপাত হয়ে যেত। মোট পাঁচবার গর্ভপাত হয়েছে—কখনো প্রথম তিন মাসে, আবার একবার মাঝামাঝি সময়েও। ভাইয়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল, এত কষ্টে যেন মেয়ের সুন্দর সংসার ভেঙে না যায়। আমিও বিষয়টি নিয়ে সব সময় ভীষণ চিন্তিত থাকতাম।
গত বছর ওমান থেকে দেশে ফেরার সময় বিমানে বসে হঠাৎ মেয়েটির কথাই বারবার মনে পড়ছিল। দেশে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই সে আবার গর্ভধারণ করল। এবার যমজ সন্তান। আমি শুরু থেকেই ওর চিকিৎসা নিজের তত্ত্বাবধানে রাখি। ম্যাকডোনাল্ড সারক্লাজ করি এবং নিয়মিত ফলো-আপের জন্য আমার বাসার কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা করি। কিন্তু ২৮ সপ্তাহে হঠাৎ পানি ভেঙে যায়। খুব ছোট গর্ভকাল, যমজ সন্তান—আমরা সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। অনেক সংগ্রাম, চিকিৎসা, দোয়া আর অপেক্ষার পর আজ সেই দুটি যমজ কন্যাশিশু সুস্থ আছে। এখন তাদের বয়স প্রায় ছয় মাস। ওদের হাসিমুখ দেখলে মনে হয়—সব কষ্ট, সব অপেক্ষা সার্থক হয়েছে।
কয়েকদিন আগে শরীফুল ভাই হজ পালন করে দেশে ফিরেছেন। ফিরে তিনি আমার জন্য জমজমের পানি, খেজুর, কাপড়সহ অনেক উপহার নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় উপহার ছিল তাঁর হৃদয়ের কথা। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘দিদি, আমি কাবা শরীফে আপনার জন্য দোয়া করেছি। আল্লাহ যেন আপনাকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখেন। আপনার জন্যই আজ আমাদের পরিবার পূর্ণতা পেয়েছে।’
এই কথাগুলো শুনে আমার চোখ ভিজে উঠেছিল। আমি বললাম, ‘ভাই, চলুন আজ আমরা একটা ছবি তুলি।’ ছবি তোলার সময় তিনি আবেগে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘দিদি, আপনি আমাকে এত সম্মান দিলেন!’ আমি শুধু হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, সম্মান তো আপনি অনেক আগেই অর্জন করেছেন—আপনার ভালোবাসা, আপনার বিশ্বাস আর আপনার আন্তরিকতার মাধ্যমে।
এভাবেই একজন রোগী আর একজন চিকিৎসকের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভাই-বোনের সম্পর্কে পরিণত হয়। এখানে ধর্মের ভেদাভেদ নেই, সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য নেই, ধনী-গরিবের বিভাজন নেই। ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর মানবিকতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আপনারা সবাই আমার ভাই শরীফুল ইসলাম, তাঁর পুরো পরিবার এবং সেই দুটি ছোট্ট যমজ কন্যার জন্য আশীর্বাদ করবেন। আমার জন্যও দোয়া করবেন, যেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানুষের এই অমূল্য ভালোবাসার মর্যাদা রাখতে পারি। চিকিৎসকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু সফল অপারেশন নয়—মানুষের হৃদয়ে আপনজন হয়ে বেঁচে থাকা।
এসইউ
এডমিন 




